শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ট্রাম্পের আপত্তি উপেক্ষা করে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর ঘোষণা জেলেনস্কির

রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল চুক্তি ঘিরে ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে টানাপোড়েন; মার্কিন গোয়েন্দা ও স্যাটেলাইট সহায়তা নিয়েও উদ্বেগ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ডিজেল সরবরাহসংক্রান্ত সমঝোতাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির মধ্যেই তিনি এ অবস্থান জানালেন।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা না চালানোর বিধিনিষেধ ইউক্রেন আর মানবে না।

এর আগে ট্রাম্প রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর দাবি, এসব হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বেড়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সমঝোতা নিয়ে ক্ষুব্ধ কিয়েভ

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে রাশিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ট্রাম্প প্রশাসন। এর বিনিময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয় মস্কো।

এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জেলেনস্কি বলেন, এটি দুর্বল সিদ্ধান্ত, যা রাশিয়াকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে উৎসাহিত করতে পারে।

ইউক্রেনের কয়েকটি ইউরোপীয় মিত্রদেশও ওয়াশিংটন-মস্কো সমঝোতার সমালোচনা করেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে।

এ নিয়ে শনিবার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রসঙ্গও তোলেন।

‘ট্রাম্প যখন অন্য পক্ষ বেছে নেন, তখন কষ্ট হয়’

বুধবার ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ডিজেল সরবরাহ চুক্তিতে তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করছেন।

জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন ইউক্রেনের পরিবর্তে অন্য পক্ষের অবস্থানকে গুরুত্ব দেন, তখন তা তাঁর জন্য বেদনাদায়ক।

ট্রাম্পকে দেওয়া পরামর্শ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তাঁর মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছেন না।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জেলেনস্কি মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে স্বচ্ছ ও আন্তরিক অবস্থান প্রত্যাশা করেন।

‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ নিয়েও মতবিরোধ

গত রোববার ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি আকস্মিক ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র ঘোষণা দেন।

তবে জেলেনস্কি দাবি করেছেন, এ ধরনের কোনো সমঝোতা সম্পর্কে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না।

বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠক করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।

বৈঠকের পর রুটে জানান, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং ইউক্রেনকে ন্যাটো মিত্রদের অব্যাহত সহায়তার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে বৈঠক সম্পর্কে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় জেলেনস্কি কোনো জ্বালানি যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ করেননি।

রাশিয়ার অভিযোগ, শান্তি প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছে ইউক্রেন

এদিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের নতুন হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্রেমলিন।

রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের দাবি, মস্কোর দক্ষিণে একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অভিযোগ করেন, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা অব্যাহত রেখে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তাঁর দাবি, মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে চেষ্টা চালালেও কিয়েভের সামরিক পদক্ষেপ সেই উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মার্কিন স্যাটেলাইট সহায়তা নিয়েও নতুন সংকট

ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে দূরপাল্লার হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে।

একই সময়ে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত স্টারশিল্ড (Starshield) স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্নের অভিযোগ উঠেছে।

ইউক্রেনীয় বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ, শত্রুপক্ষের হামলা শনাক্তকরণ এবং প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

কর্মকর্তাদের দাবি, বুধবার যোগাযোগের গতি কমে যাওয়ায় কিছু সামরিক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেয়।

স্টারশিল্ড নিয়ে ইলন মাস্কের বক্তব্য

স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিঘ্নের ঘটনায় নিজের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্টারশিল্ড ব্যবস্থা মার্কিন সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন। এর ব্যবহার বা গতিসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের অধীনে থাকে।

স্টারশিল্ড ও বেসামরিক স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা আলাদা। ইউক্রেন উভয় প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও সামরিক কার্যক্রমে স্টারশিল্ডের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

তবে যোগাযোগ বিঘ্নের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত বা কারিগরি কারণ ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

রুশ হামলায় বিপর্যস্ত ইউক্রেনের জনজীবন

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো বারবার হামলার শিকার হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় রাশিয়ার হামলা বেড়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার ও বুধবার রাতে কিয়েভ এবং আশপাশের এলাকায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। কিয়েভের যুক্তি, এসব স্থাপনা থেকে অর্জিত আয় রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করে।

বর্তমানে ক্রিমিয়াসহ ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন অনিশ্চয়তায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সমঝোতা, ইউক্রেনের পাল্টা হামলার ঘোষণা এবং মার্কিন সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখা ও শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে ইউক্রেন মনে করছে, রাশিয়ার ওপর চাপ কমানো হলে মস্কো সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন