গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে নতুন বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নয়, মেয়াদও বাড়বে না; বাজারভিত্তিক সারের দাম নির্ধারণ ও কৃষক কার্ডে সরাসরি সহায়তার সুপারিশ বিশ্বব্যাংকের
বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সরকারি ভর্তুকির চাপ কমাতে নীতিগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ খাতে গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে নতুন ক্রয়চুক্তি না করা এবং এ ধরনের বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সারের ওপর সরকারি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণ এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যোগ্য কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার আরও কার্যকর করা। একই সঙ্গে ভর্তুকির সুবিধা যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গত ৬ অক্টোবর অর্থ বিভাগকে পাঠানো এক চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধানের কারণে সরকারের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা কমাতে নতুন নীতি নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তিন বছরের সংস্কার রোডম্যাপের অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়নেও ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সামনে রেখে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমাতে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে অর্থ বিভাগকে এ ব্যাখ্যা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর আগে ভর্তুকি কমাতে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল অর্থ বিভাগ।
বিদ্যুৎ ক্রয়ে নতুন নীতি
বিদ্যুৎ বিভাগের নতুন নীতি অনুযায়ী, গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার জন্য নতুন কোনো চুক্তি করা হবে না। একইভাবে, গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দর নির্ধারিত রয়েছে—এমন বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির মেয়াদও বাড়ানো হবে না। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের ট্যারিফ সমন্বয়ের মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ আশা করছে, এসব পদক্ষেপের ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির প্রয়োজন কমবে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও হ্রাস পাবে। তবে এ উদ্যোগের ফলে ঠিক কত টাকা সাশ্রয় হবে, সে বিষয়ে চিঠিতে কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সংস্থাটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ১২ টাকা ৮০ পয়সায় কিনে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করে। এতে প্রতি ইউনিটে ৪ টাকা ৩০ পয়সা ঘাটতি থাকে, যা ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
বিপিডিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সার্বিক গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা।
বিপিডিবির সূত্র জানায়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৩ টাকা ৫৭ পয়সায় এবং ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে ১৪ টাকা ৮৬ পয়সায় কেনা হচ্ছে। আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গড় উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বেশি দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ক্রয়নীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম ইতোমধ্যে গড় দরের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। অন্য কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে একই পদ্ধতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমানোর চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দামের অস্থিরতার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমানোকে নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, সরকারের আর্থিক দায় কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম সাশ্রয়ী রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস ইনস্টিটিউটের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম টিবিএসকে বলেন, গড় লেভেলাইজড ট্যারিফের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ উদ্যোগ ভর্তুকি কমাতে এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ব্যয় হ্রাস করতে সহায়তা করবে। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপও কমতে পারে, যা গ্রাহকদের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
তবে তিনি বলেন, এ নীতি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। বিভিন্ন ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের লেভেলাইজড ট্যারিফে পার্থক্য রয়েছে। এমনকি একই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যেও ব্যয়ের তারতম্য থাকতে পারে। গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং একটি কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে কি না, তার ওপরও উৎপাদন ব্যয় নির্ভর করে।
তাই গড় ট্যারিফ নির্ধারণের জন্য গ্রহণযোগ্য ও সুস্পষ্ট কারিগরি পদ্ধতি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। শফিকুল আলমের মতে, যথাযথভাবে নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি কমার পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
সারের ভর্তুকিতে বড় কৃষকদের বেশি সুবিধা
বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি কৃষি খাতেও ভর্তুকির কাঠামো পুনর্বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি সারের ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক সুবিধা পান বড় কৃষকেরা। অন্যদিকে, দেশের মোট কৃষকের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক হলেও তাঁরা ভর্তুকির মাত্র ১৩ শতাংশ পান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষিজমির প্রায় ২০ শতাংশের মালিক বড় কৃষকেরা। কৃষকদের আয়ের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করলে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ কৃষক সরকারের সরাসরি সহায়তার এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি পান। বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ কৃষক পান প্রায় অর্ধেক সুবিধা।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সারের মতো ব্যয়বহুল ভর্তুকি কর্মসূচির সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি যাচ্ছে বড় ও সচ্ছল কৃষকদের কাছে। ফলে সীমিত সরকারি সম্পদ দিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাজারভিত্তিক সারের দাম ও কৃষক কার্ডে সহায়তার প্রস্তাব
গত পাঁচ বছরে সারের ভর্তুকি প্রায় চার গুণ বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ধীরে ধীরে সারের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তুলে নিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের দিকে যাওয়ার সুপারিশ করেছে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দিতে কৃষক কার্ডের সঙ্গে ইলেকট্রনিক ভাউচার যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। এতে সারের বিক্রয়মূল্য ও সরকারি সহায়তাকে পৃথক করে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সহজ হতে পারে।
কৃষি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, সরকার বিশ্বব্যাংকের সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিক্রির সময় ভর্তুকি দিয়ে দাম কম রাখার পরিবর্তে সারের প্রকৃত দামেই তা বিক্রি করা হবে। এর পরিবর্তে যোগ্য কৃষকদের কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সরকার কৃষকদের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করছে। এতে প্রতিটি কৃষকের জমির পরিমাণ, কতটুকু জমিতে চাষাবাদ করেন, কী ধরনের ফসল উৎপাদন করেন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণ ও কৃষকদের কাছে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
তবে সারের দাম বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় ও ফসলের উৎপাদনমূল্যে কী প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে সহায়তার পরিমাণ, যোগ্যতা নির্ধারণের পদ্ধতি এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর।
আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা
ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা করবে বলে অর্থ বিভাগের সূত্র জানিয়েছে। তবে বৈঠকের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে নতুন একটি ঋণসহায়তা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে কর্মসূচিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে আইএমএফের নিয়মিত প্রতিনিধিদল গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে আগের ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন কর্মসূচি চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ।
সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো ভর্তুকির ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখা। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির নতুন নীতি ও কৃষকদের সরাসরি সহায়তার পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারি অর্থের ব্যবহার আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

