রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

গাড়ি নাকি উড়ন্ত যান? স্পেসএক্স প্রযুক্তির নতুন রোডস্টারে যত চমক

স্পেসএক্সের রকেট প্রযুক্তিসম্পন্ন দুই আসনের স্পোর্টস কার, শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল গতি নিতে সময় লাগবে এক সেকেন্ডেরও কম; উৎপাদন শুরু ২০২৮ সালে

প্রায় এক দশক ধরে অগ্রিম অর্থ নেওয়া ও বারবার উৎপাদনের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার পর অবশেষে নতুন প্রজন্মের বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার ‘রোডস্টার’ উন্মোচন করেছে মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা। গাড়িটিতে স্পেসএক্সের রকেট প্রযুক্তি যুক্ত করার কথা জানিয়েছে কোম্পানিটি। টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের ঘোষণা অনুযায়ী, গাড়িটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে ২০২৮ সালে।

সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ওয়েকোর কাছে অবস্থিত স্পেসএক্সের একটি পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে উন্মোচনী অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানে মাস্কের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন টেসলার নকশাপ্রধান ফ্রাঞ্জ ভন হোলজহাউসেন এবং যানবাহন প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লার্স মোরাভি।

উন্মোচনী মঞ্চে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মাস্ক বলেন, “আজ রাতে আপনারা একদম পাগলাটে কিছু দেখতে যাচ্ছেন। বিশ্বের সেরা গাড়ি নির্মাতা ও রকেট কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে কী ঘটে আজ রাতে আপনারা তারই ফলাফল দেখতে পাবেন।”

রকেট প্রযুক্তিতে ভিন্নধর্মী রোডস্টার

টেসলার দাবি অনুযায়ী, নতুন রোডস্টারটি দুই আসনের এবং অত্যন্ত দ্রুতগতির গাড়ি। শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল—প্রায় ৯৭ কিলোমিটার—গতি তুলতে এতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় লাগবে।

উন্মোচনী অনুষ্ঠানে গাড়িটির সক্ষমতা তুলে ধরতে একটি সাদা রঙের স্পোর্টস কারের প্রদর্শনী দেখানো হয়। গাড়িটি দ্রুতগতিতে একটি বাঁকানো র‍্যাম্প বেয়ে ওপরে উঠে উল্টো হয়ে আটকে থাকে। এরপর শূন্যে লাফিয়ে উঠে মাঝ আকাশে ঘুরে ধীরে ধীরে ভেসে মাটিতে অবতরণ করে। টেসলার যানবাহন প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লার্স মোরাভি নিজেই গাড়িটি চালিয়ে এ প্রদর্শনী করেন।

নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্সের তৈরি একগুচ্ছ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে টেসলা। এর মধ্যে রয়েছে রকেট থ্রাস্টার, কার্বন ওভারলে প্রেশার ভেসেল, ডিফিউজার ও শক্তিশালী ফ্যান। এসব প্রযুক্তি গাড়িটির গতি ও ব্রেকিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শূন্যে বিভিন্ন কসরত দেখানোর কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

গাড়িটিকে হালকা ওজনের করে তৈরির পাশাপাশি এতে যুক্ত করা হয়েছে ‘স্টিয়ার-বাই-ওয়্যার’ ব্যবস্থা ও স্টিয়ারিং ইয়োক। তবে গাড়িটির বিভিন্ন সংস্করণের পারফরম্যান্স, কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও দাম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।

২০১৭ সালে ঘোষণা, উৎপাদনের সময়সীমা ২০২৮

নতুন প্রজন্মের রোডস্টারের ধারণা প্রথম প্রকাশ করা হয়েছিল ২০১৭ সালের নভেম্বরে। পরের বছরের জুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বার্তায় মাস্ক জানিয়েছিলেন, গাড়িটির ‘স্পেসএক্স অপশন প্যাকেজে’ চারপাশে সাজানো প্রায় ১০টি ছোট রকেট থ্রাস্টার থাকবে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব থ্রাস্টার গাড়িটির গতি ও ব্রেকিং ব্যবস্থাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় উন্নত করবে এবং এমনকি গাড়িটিকে ওড়ার সক্ষমতাও দিতে পারে।

তবে প্রদর্শনীতে গাড়িটির শূন্যে ভেসে থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হলেও এর বাস্তব ব্যবহার, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে গাড়িটির চূড়ান্ত বাণিজ্যিক সংস্করণে এসব প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

মাস্ক জানিয়েছেন, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু হবে। তবে এর দাম বা সম্ভাব্য সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। টেসলা সম্প্রতি গাড়িটির আগাম বুকিং কার্যক্রমও পুনরায় চালু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও চীনের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার ডলার করে অগ্রিম নেওয়া হচ্ছে।

মূল রোডস্টারের ইতিহাস

টেসলার প্রথম রোডস্টার তৈরি হয়েছিল কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী মার্টিন এবারহার্ডের নেতৃত্বাধীন একটি দলের উদ্যোগে। লোটাস এলিসের শ্যাসির ওপর ভিত্তি করে তৈরি গাড়িটি ২০০৮ সালে প্রথম ক্রেতাদের হাতে পৌঁছায়। প্রায় এক লাখ ডলারের ওই মডেলটি ২০১২ সাল পর্যন্ত সীমিত সংখ্যায় বিক্রি হয়েছিল।

নতুন প্রজন্মের রোডস্টারকে আগের মডেলের তুলনায় আরও উন্নত ও উচ্চগতির গাড়ি হিসেবে তুলে ধরছে টেসলা। তবে এটি সীমিত সংখ্যায় উৎপাদিত হবে কি না, সে বিষয়ে কোম্পানি বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

বারবার পিছিয়েছে সরবরাহের সময়সীমা

নতুন রোডস্টারের জন্য টেসলা ২০১৭ সাল থেকেই ৫০ হাজার ডলার করে অগ্রিম নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু এরপর থেকে গাড়িটি সরবরাহের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা বারবার পিছিয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরেও মাস্ক নতুন রোডস্টারের একটি প্রদর্শনী আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেটি ২০২৫ সালের শেষ হওয়ার আগেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

দীর্ঘ বিলম্ব নিয়ে গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে টেসলাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন মাস্কের সাবেক বন্ধু ও ওপেনএআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান। নিজের বুকিং এবং অর্থ ফেরত চাওয়ার আবেদনের স্ক্রিনশট প্রকাশ করে তিনি লিখেছিলেন, “গাড়িটি নিয়ে আমি সত্যিই খুব উত্তেজিত ছিলাম! বিলম্ব হতেই পারে, সেটা আমি বুঝি। তবে সাড়ে সাত বছর অপেক্ষা করাটা বাড়াবাড়ি বলে মনে হচ্ছে।”

পরে অল্টম্যান তাঁর জামানতের অর্থ ফেরত পান। এরপর ওপেনএআইয়ের পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকানা কাঠামো নিয়ে পৃথক বিরোধের জেরে মাস্ক ও অল্টম্যানের দ্বন্দ্ব আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তবে দীর্ঘ অপেক্ষা সত্ত্বেও অনেক ক্রেতা তাঁদের রোডস্টারের বুকিং বহাল রেখেছেন।

টেসলার আয়ে কতটা প্রভাব ফেলবে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্কের ভক্তদের মধ্যে নতুন রোডস্টার নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেলেও বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, গাড়িটি টেসলার মূল ব্যবসায়িক আয় বা সামগ্রিক আর্থিক চিত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না। উচ্চমূল্যের ও সীমিত পরিসরের এ মডেলের চেয়ে কোম্পানিটির বৃহত্তর গাড়ি ব্যবসা এবং অন্যান্য কার্যক্রম আর্থিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, বুধবার শেয়ারবাজারের লেনদেন শেষে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা রয়েছে টেসলার। ওই প্রতিবেদন থেকে কোম্পানিটির সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন