নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধি, সড়কে বিশৃঙ্খলা ও মালিকানাকেন্দ্রিক লাভের হিসাব; জীবিকার সুযোগ বজায় রেখে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াত ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এই যান এখন সড়কে শৃঙ্খলা, যানজট, নিরাপত্তা এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অনেক সড়কে বেপরোয়া চলাচল, উল্টো পথে প্রবেশ এবং অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, অটোরিকশার সংখ্যা কতটা বেড়েছে, কারা এসব যান নামাচ্ছেন এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা কোথায়।
গত ৫ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে অটোরিকশাচালকদের একটি মিছিল মতিঝিলের দিকে যাওয়ার সময় ‘রাস্তা আছে যেখানে, অটো চলবে সেখানে’ স্লোগান দেয়। এ স্লোগানকে ঘিরে সড়কে যান চলাচলের নিয়ম, চালকদের অধিকার এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সড়কে চালকদের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ
একজন প্রাইভেটকারচালকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লেখাটিতে বলা হয়েছে, আগে সড়কে চলার সময় ট্রাফিক পুলিশের জরিমানা বা গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে ঝামেলার আশঙ্কা বেশি কাজ করত। এখন তাঁর কাছে বেপরোয়া অটোরিকশাচালকদের আচরণ বড় উদ্বেগের কারণ। তাঁর অভিযোগ, অটোরিকশা উল্টো পথে এসে বা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে ঘষা লাগিয়ে ক্ষতি করলেও চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই অভিজ্ঞতা রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে কোনো একটি চালকের অভিজ্ঞতা দিয়ে সব অটোরিকশাচালকের আচরণ বিচার করা যায় না। সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে চালকদের পাশাপাশি সব ধরনের যানবাহনের ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা জরুরি।
ভিআইপি সড়কেও অটোরিকশার চলাচল
রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট ও বিজয় সরণিসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লেখাটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু অটোরিকশা এমন সড়কেও চলাচল করছে, যেখানে তাদের প্রবেশের অনুমতি নেই; কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো পথে চলার ঘটনাও দেখা যায়।
অন্যদিকে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, বাস ও ট্রাকের কাগজপত্র যাচাই এবং ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনায় মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান। অটোরিকশার ক্ষেত্রে একই ধরনের তৎপরতা দেখা না যাওয়ার কারণ কী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভীতি, স্বার্থসংশ্লিষ্টতা কিংবা সম্ভাব্য আন্দোলনের আশঙ্কা কাজ করছে কি না—লেখাটিতে এমন কয়েকটি সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দেওয়া হয়নি। ফলে এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
জীবিকার প্রয়োজন ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি বহু মানুষের জীবিকার উৎস। তুলনামূলক কম শারীরিক পরিশ্রমে চালানো যায় এবং স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতে সুবিধা দেয় বলে অনেক যাত্রী ও চালকের কাছে যানটি জনপ্রিয় হয়েছে।
এ কারণে রাজধানী কিংবা দেশের অন্যান্য শহর থেকে অটোরিকশা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার বদলে কোন সড়কে কী ধরনের যান চলবে, কতটি যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে এবং চালকদের কী ধরনের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ থাকতে হবে—এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন।
লেখাটিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী অটোরিকশার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকলে সড়কের বড় অংশ এসব যান দখল করে নিতে পারে। সে সময়ই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বলেছিলেন।
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সমাধান কঠিন
লেখাটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২০ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের একক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ সমস্যা সমাধানে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অটোরিকশার নিবন্ধন, চলাচলের অনুমতি, নির্ধারিত রুট, চালকের পরিচয় যাচাই এবং নিরাপত্তাবিধি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কোন সংস্থার ওপর থাকবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুমোদনহীন যানবাহন শনাক্ত, নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে শাস্তি নিশ্চিত এবং সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থাও জরুরি।
শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অটোরিকশাচালকদের জীবিকা, যাত্রীদের প্রয়োজন, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং অন্যান্য যানবাহনের চলাচল—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অটোরিকশার মালিকানা ও লাভের হিসাব
অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে মালিকানাভিত্তিক বিনিয়োগের বিষয়টিও লেখাটিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একটি অটোরিকশা কিনতে আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয় এবং চালকের কাছ থেকে দৈনিক প্রায় ৫০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। সে হিসাবে ১০টি অটোরিকশা থেকে দৈনিক মোট ভাড়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই অঙ্ককে নিট মুনাফা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। গাড়ির মেরামত, ব্যাটারি পরিবর্তন, অবচয়, গ্যারেজ ভাড়া, বিদ্যুৎ খরচ, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি ও অন্যান্য ব্যয় হিসাব করলে প্রকৃত আয় ভিন্ন হতে পারে। এ ছাড়া অটোরিকশার মালিকদের পেশাগত পরিচয় বা বিনিয়োগের পরিমাণ সম্পর্কে লেখাটিতে যেসব উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর স্বাধীন যাচাইও প্রয়োজন।
তারপরও অটোরিকশা থেকে নিয়মিত আয় পাওয়ার সম্ভাবনা নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। মালিকানা ও নিবন্ধনের নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে প্রকৃত সংখ্যা, বিনিয়োগের পরিমাণ এবং এই খাতের অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া কঠিন।
দাবি আদায়ের আন্দোলন ও নীতিনির্ধারণের প্রশ্ন
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন গোষ্ঠীর আন্দোলন, দাবি আদায়ের কর্মসূচি এবং সড়ক অবরোধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লেখাটিতে অটোরিকশাচালকদের আন্দোলনকে সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা হয়েছে। তবে আন্দোলনের আশঙ্কায় সরকার বা পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে আইন প্রয়োগ থেকে বিরত রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।
অটোরিকশাচালকদের সংগঠিত প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং প্রচলিত আইন কার্যকর করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো গোষ্ঠীর চাপের কারণে আইন প্রয়োগ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সমাধান কোথায়
অটোরিকশা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথম প্রয়োজন দেশের শহরগুলোতে এসব যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা ও মালিকানার তথ্য সংগ্রহ। এরপর নিবন্ধন ও অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা, সড়কভিত্তিক চলাচলের নিয়ম, চালকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তাবিধি এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে যেসব এলাকায় অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ বা সীমিত, সেখানে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। চালকদের জীবিকা যাতে হঠাৎ বিপর্যস্ত না হয়, সে জন্য পর্যায়ক্রমে নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং তাঁদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা জরুরি। সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও চালক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার টেকসই সমাধান কঠিন।
অটোরিকশা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা ও স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের প্রয়োজন মেটায়—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা বৃদ্ধি, বেপরোয়া চলাচল এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই অটোরিকশা তুলে দেওয়া কিংবা সব ধরনের চলাচল নির্বিচারে অনুমোদন করার পরিবর্তে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং সবার জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ।

