৫০টির বেশি বাস পরিদর্শনে অনিয়মের চিত্র; প্রায় ৮০ শতাংশ বাসে নেই সহায়ক, নির্ধারিত স্থানের বাইরে যাত্রী ওঠা-নামায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
রাজধানী ঢাকার লোকাল বাসগুলো নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্ক যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সংরক্ষিত আসনের নিয়ম লঙ্ঘন, বাসে যাত্রী ব্যবস্থাপনায় সহায়কের অভাব এবং অনিরাপদভাবে যাত্রী ওঠা-নামার কারণে এসব যাত্রীকে নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। নির্ধারিত বাসস্টপের বাইরে যাত্রী ওঠা-নামা এবং অতিরিক্ত ভিড় পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
জাতীয় নৌপরিবহন, সড়ক ও রেলপথ সুরক্ষা কমিটি (এনসিপিএসআরআর) এবং নৌপরিবহন ও যোগাযোগ প্রতিবেদক ফোরাম (এসসিআরএফ) পরিচালিত এক পর্যবেক্ষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সেপ্টেম্বরে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ৫০টির বেশি বাস পরিদর্শন করে সংস্থা দুটি। আজ রোববার (১১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পর্যবেক্ষণের ফলাফল তুলে ধরা হয়।
কোনো বাসেই সংরক্ষিত আসনের নির্দেশনা পুরোপুরি মানা হয়নি
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পরিদর্শন করা কোনো বাসেই নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মুক্তিযোদ্ধা ও বয়স্কদের জন্য প্রতিটি বাসে নয়টি আসন সংরক্ষণের সরকারি নির্দেশনা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি।
কিছু বাসে সংরক্ষিত আসনসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনার বিজ্ঞপ্তি থাকলেও অধিকাংশ বাসে তা প্রদর্শন করা হয়নি। ফলে সংরক্ষিত আসন সম্পর্কে যাত্রীদের সচেতনতা এবং নিয়মের বাস্তব প্রয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
ভিড়ে ঠাসা লোকাল বাসে অনেক সময় পুরুষ যাত্রীরা সংরক্ষিত আসনে বসে থাকেন। অন্যদিকে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্ক যাত্রীদের দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে এবং তাঁদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রায় ৮০ শতাংশ বাসে নেই সহায়ক
পর্যবেক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, পরিদর্শন করা প্রায় ৮০ শতাংশ বাসে যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য পরিচালন কাজে সহায়তার জন্য কোনো সহায়ক পাওয়া যায়নি। বাসে চালক ও কন্ডাক্টর থাকলেও অতিরিক্ত সহায়ক না থাকায় যাত্রী ওঠা-নামা এবং ভিড় সামলানোর দায়িত্ব সীমিত কর্মীর ওপর পড়ে।
পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বাসচালক মালিকের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে বাস ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করেন এবং যাত্রী ব্যবস্থাপনার জন্য কন্ডাক্টর নিয়োগ দেন। দিন শেষে মালিককে নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধের পর অবশিষ্ট আয় নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন তাঁরা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আয় বাড়ানোর প্রবণতা থেকে চালক ও কন্ডাক্টররা সহায়ক নিয়োগ এড়িয়ে চলেন। এর ফলে যাত্রী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি তৈরি হয় এবং নিরাপদে ওঠা-নামার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে।
নির্ধারিত স্টপের বাইরে যাত্রী ওঠা-নামা
বাসস্টপ ব্যবস্থাপনায়ও অনিয়মের চিত্র পেয়েছে পর্যবেক্ষক দল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কন্ডাক্টররা নির্ধারিত স্টপের পাশাপাশি রাস্তার পাশের অননুমোদিত স্থানেও বাস থামান। এতে যাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে বাসে ওঠেন ও নামেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের অনিরাপদ ওঠা-নামার কারণে প্রায় প্রতিদিনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এসব দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি।
যাত্রী নিরাপত্তায় চার দফা সুপারিশ
ঢাকার লোকাল বাসে যাত্রীসেবা উন্নত করা এবং পরিবহনবিধি কার্যকরভাবে মানা নিশ্চিত করতে এনসিপিএসআরআর ও এসসিআরএফ কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি সিটি বাসে নয়টি সংরক্ষিত আসন নিশ্চিত করা এবং এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রদর্শন করা।
- চালক ও কন্ডাক্টরের পাশাপাশি প্রতিটি বাসে একজন সহায়ক নিয়োগ দেওয়া।
- চালক বা কন্ডাক্টরের কাছে দৈনিক চুক্তিতে বাস ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল করা।
- সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্টপের বাইরে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
সংস্থা দুটি মনে করে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে যাত্রী ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বাড়বে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীরা তুলনামূলক নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন এবং সড়কে অনিরাপদভাবে বাস থামানোর প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।
‘নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই চলছে লোকাল বাস’
এনসিপিএসআরআর-এর সাধারণ সম্পাদক আশিস কুমার দে বলেন, ঢাকার লোকাল বাসগুলো নিয়মকানুনের তেমন তোয়াক্কা না করেই চলাচল করছে। তাঁর অভিযোগ, বাস মালিকদের কাছে মানসম্মত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার চেয়ে মুনাফা বাড়ানো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি অনিয়ম দমনে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পরিবহনবিধি বাস্তবায়ন এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান।
‘গণপরিবহনের দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলার চিত্র’
এসসিআরএফ-এর সাধারণ সম্পাদক লায়ন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম পর্যবেক্ষণের ফলাফলকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলার একটি চিত্র হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, সমস্যাগুলো সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করছে তাঁদের সংগঠন, যাতে পরিস্থিতি উপেক্ষা করার সুযোগ না থাকে। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই মাসব্যাপী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁদের উদ্যোগ সারা বছর অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব
পর্যবেক্ষণে উঠে আসা চিত্র অনুযায়ী, ঢাকার লোকাল বাসে যাত্রী নিরাপত্তা ও সেবার মান বাড়াতে শুধু নির্দেশনা জারি করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। সংরক্ষিত আসন নিশ্চিত করা, বাসে প্রয়োজনীয় কর্মী রাখা এবং নির্ধারিত স্টপের বাইরে যাত্রী ওঠা-নামা বন্ধ করা গেলে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্কদের ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি সামগ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।

