বাঁশের সাঁকো ভেঙে গেলে নৌকা কিংবা বুকসমান পানিতে নদী পারাপার, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থী-রোগী-কৃষক; সেতু নির্মাণের উদ্যোগের অপেক্ষায় এলাকাবাসী
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বালিঝুড়ি গ্রাম। গ্রামটির মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ভারত থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদী। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও নদীটির ওপর নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী সেতু। ফলে বালিঝুড়িসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে স্বাভাবিক যাতায়াত, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। নিজেদের উদ্যোগে নদীর ওপর বাঁশ-কাঠের সাঁকো তৈরি করেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে সেই সাঁকো ভেঙে গেলে নৌকা কিংবা বুকসমান পানির মধ্য দিয়ে নদী পার হতে হয়।
সেতুর অভাবে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ
সোমেশ্বরী নদীর প্রবাহের কারণে গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষা খাড়ামোড়া, রাঙাজান, কোচপাড়া, তাওয়াকুচা ও বালিজুরী গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হচ্ছে। এসব গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু এখনো অধরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামগুলোর যোগাযোগের জন্য একটি রাস্তা থাকলেও নদী পারাপারের বিকল্প ব্যবস্থা নেই। এ কারণে নিজেদের উদ্যোগ ও অর্থে বাঁশ-কাঠ সংগ্রহ করে নদীর ওপর অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করেছেন তাঁরা। কিন্তু পাহাড়ি ঢলের পানি বাড়লে সাঁকোটি প্রায়ই ভেঙে যায়। তখন বাধ্য হয়ে নৌকায় নদী পার হতে হয়। কোনো কোনো সময় বুকসমান পানির মধ্য দিয়েও যাতায়াত করতে হয়।
এভাবে প্রতিদিন নদী পারাপার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। তাঁদের কাছে সেতু নির্মাণ শুধু যাতায়াতের সুবিধা নয়, বরং নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের দীর্ঘদিনের দাবি।
শিক্ষার্থী, কৃষক ও রোগীদের দুর্ভোগ বেশি
নদী পারাপারের সমস্যায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। বর্ষাকালে নদীর পানি বেড়ে গেলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
কৃষকদের ক্ষেতেও সমস্যাটি কম নয়। উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে নদী পারাপারের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেতু না থাকায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময় লাগে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
অন্যদিকে, কোনো রোগীর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। নদীর স্রোত, পানির উচ্চতা এবং পারাপারের অনিশ্চয়তার কারণে জরুরি সময়ে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় স্বজনদের।
প্রস্তাবিত সেতুর দৈর্ঘ্য বাড়ানোর পরামর্শ, স্থগিত কার্যক্রম
সেতু নির্মাণের উদ্যোগ সম্পর্কে শ্রীবরদী উপজেলা প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ‘হান্ডেড মিটার’ প্রকল্পের আওতায় একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল প্রস্তাবিত সেতুর দৈর্ঘ্য আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। এ কারণে বর্তমানে প্রকল্পটির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
সেতুর দৈর্ঘ্য নির্ধারণের বিষয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে দীর্ঘদিনের যোগাযোগসংকট নিরসনে প্রকল্পটির পরবর্তী কার্যক্রম কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।
অর্থ বরাদ্দ পেলে নির্মাণকাজ শুরুর আশ্বাস
শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা আহমেদ বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবিটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
এদিকে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে চলা এই দুর্ভোগের বিষয়টি সেতুমন্ত্রী, প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নদীর প্রবল স্রোত ও ভাঙনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এলাকায় একটি টেকসই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের অপেক্ষা
সোমেশ্বরী নদীর ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় বালিঝুড়িসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অস্থায়ী সাঁকো ভেঙে যাওয়া, বর্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি ব্যয়—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করবে। এতে কয়েকটি গ্রামের মানুষের নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

