শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তি

আর্কটিকে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব বহাল

• যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি
• গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের সুযোগ
• চুক্তির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই
• প্রতিপক্ষ শক্তির সামরিক উপস্থিতি ও সংবেদনশীল বিনিয়োগ ঠেকানোর ব্যবস্থা
• ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও গ্রিনল্যান্ডবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বহাল

আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড নতুন একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির ফলে দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

ট্রাম্প বলছেন ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’

চুক্তি স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এর আগেই তিনি দাবি করেছিলেন, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা পাবে।

হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ীভাবে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার অধিকারসহ উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত কোনো শক্তি যাতে সেখানে সামরিক ঘাঁটি, সামরিক উপস্থিতি বা সংবেদনশীল বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও এতে রাখা হয়েছে।

তবে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হচ্ছে না

ট্রাম্পের ‘permanent control’ বক্তব্যের কারণে চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করছে—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। কিন্তু চুক্তির আনুষ্ঠানিক কাঠামো তা বলছে না।

ডেনমার্ক সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তিতে কিংডম অব ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত ও সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, এই সমঝোতা গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ন্যাটো এবং ইউরোপের নিরাপত্তাকেও শক্তিশালী করবে।

প্রতিপক্ষকে দূরে রাখাই লক্ষ্য

চুক্তির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করা।

চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ফ্রেডেরিকসেন ট্রাম্পের নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, প্রতিপক্ষ শক্তিকে গ্রিনল্যান্ডের খুব কাছে আসতে দেওয়া হবে না। নতুন ব্যবস্থার অধীনে কোনো প্রতিপক্ষ শক্তি যাতে দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা উল্লেখযোগ্য প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সেটিই নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেনও উত্তর আমেরিকা ও ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তায় গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো, চুক্তিটি একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং আর্কটিকের যৌথ নিরাপত্তায় তাদের ভূমিকা স্বীকার করছে।

১৯৫১ সালের চুক্তির নতুন অধ্যায়

নতুন সমঝোতাটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো নিরাপত্তা কাঠামো নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে ১৯৫১ সালের Greenland Defense Agreement সংশোধন ও সম্প্রসারণ করছে।

নতুন চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ রাখা হয়নি। পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া এটি পরিবর্তন করা যাবে না।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগ করে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলেও নতুন রাষ্ট্রকে ন্যাটোর সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট অধিকার ও দায়বদ্ধতা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

কেন গ্রিনল্যান্ড এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায় দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্বও বেড়েছে।

গ্রিনল্যান্ডে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের Pituffik Space Base রয়েছে। এটি ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ, মহাকাশ নজরদারি এবং উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে প্রস্তাবিত ‘Golden Dome’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, নতুন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের সুযোগ দিচ্ছে এবং Narsarsuaq ও Mestersvig-এ নতুন মার্কিন সামরিক স্থাপনার পথ তৈরি করছে।

দীর্ঘদিনের বিরোধের পর সমঝোতা

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে আসছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি দ্বীপটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেন।

এসব বক্তব্য ন্যাটো মিত্র ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সেখানকার জনগণের—এ অবস্থান বারবার তুলে ধরে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড।

নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই দীর্ঘ কূটনৈতিক বিরোধ আপাতত একটি সমঝোতার কাঠামোয় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র পাচ্ছে বিস্তৃত নিরাপত্তা ও সামরিক সুবিধা; অন্যদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অক্ষুণ্ণ থাকছে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।

চুক্তিটি এখন সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় জাতীয় সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন