বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজীপুরে ব্রিফকেসে খণ্ডিত নারীর লাশ: পরিচয় শনাক্ত, গ্রেপ্তার ৩

গাজীপুরের জয়দেবপুরে মহাসড়কের পাশে পানিতে ব্রিফকেস ও বস্তায় পাওয়া খণ্ডিত অজ্ঞাতনামা নারীর মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বটি দা, স্কচটেপসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।

পিবিআই গাজীপুর জেলার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

পিবিআই জানায়, গত ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে পানিতে একটি ব্রিফকেস থেকে এক খণ্ড এবং অন্য একটি স্থান থেকে বস্তায় মোড়ানো আরেক খণ্ড অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি ছিল অজ্ঞাতনামা এক নারীর। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার পর পিবিআই গাজীপুর জেলার ক্রাইমসিন টিম তদন্তে নামে।

পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারীর নেতৃত্বে তদন্তকারী দল বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিহত নারীর পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে।

নিহতের নাম ডলি আক্তার ওরফে কালিয়া (৩০)। তিনি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার পাহাড়পাবইজান গ্রামের সোহেল (৪৪)-এর ছোট বোন। স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ডলি গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ী এলাকায় একাই বসবাস করতেন।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সোহেল বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন। গত ১২ সেপ্টেম্বর মামলা নম্বর-৭ হিসেবে পেনাল কোডের ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়। একই দিন পিবিআই গাজীপুর জেলা স্ব-উদ্যোগে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী।

তদন্তের শুরুতেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মো. মিশন ইসলাম, তার মা বানু আক্তার এবং মিশনের বন্ধু মো. মিজানুর রহমান লিটনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মিশনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার ঘর থেকে মরদেহ খণ্ডিত করতে ব্যবহৃত বটি দা, মরদেহ প্যাকেটজাত করতে ব্যবহৃত স্কচটেপ, নিহতের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কার্ড, বাটন মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া স্যুটকেস কেনার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিন আসামিই ১৩ সেপ্টেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, প্রায় পাঁচ বছর আগে তামান্না গার্মেন্টসে কাজ করার সময় মিশনের সঙ্গে ডলির পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধ এবং আর্থিক বিষয়কে কেন্দ্র করে মিশনের সঙ্গে ডলির বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে মিশন তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে পিবিআই জানিয়েছে।

পিবিআইয়ের তথ্যমতে, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের বাসায় গেলে সেখানে মিশনের মা বানু আক্তারের সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়। পরে মিশন ও ডলি একই কক্ষে অবস্থান করেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মিশন ডলিকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ডলি ঘুমিয়ে পড়লে রাত আনুমানিক ২টার দিকে লুঙ্গি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে এবং পা দিয়ে চেপে ধরে শ্বাসরোধ করা হয়। পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে ধরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

মরদেহটি পরে চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন মিশন একটি স্যুটকেস কিনে এনে বটি ও ব্লেড দিয়ে মরদেহ কোমর থেকে দুই খণ্ড করে। মরদেহের নিচের অংশ স্যুটকেসে এবং ওপরের অংশ পলিথিন ও বস্তায় রাখা হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে।

এরপর মিশন ও তার মা বানু আক্তার বাসা পরিবর্তনের কথা বলে মিশনের বন্ধু মিজানুর রহমান লিটনকে ডেকে আনেন। পরে তারা স্যুটকেস ও বস্তায় রাখা মরদেহ নিয়ে অটোরিকশায় রাজেন্দ্রপুর এবং সেখান থেকে সিএনজিযোগে ভবানীপুর এলাকায় যান। সেখানে ভবানীপুর সেতুর ওপর থেকে মিশন ও লিটন মরদেহভর্তি স্যুটকেস ও বস্তা খালে ফেলে দেন বলে তদন্তে জানা গেছে।

পিবিআই জানায়, মরদেহ ফেলার সময় লিটনের হাতে রক্ত লাগলে মিশন তাকে ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়। পরে তারা নিজ নিজ বাসায় চলে যায়।

তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন