রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

এক-দুই দিনের জ্বরেও ডেঙ্গু পরীক্ষা, দেরি না করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

ঢাকা, ৯ আগস্ট ২০২৬:


দেশে আবারও বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এক-দুই দিন জ্বর থাকলেই নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা এবার বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে শিশু বা পরিবারের কোনো সদস্যের জ্বর হলে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর ধরে নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও জ্বরের শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু শনাক্তের এনএস-১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। একই সময়ে সিএম পরীক্ষা (কমপ্লিমেন্ট ফিক্সেশন/প্রচলিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ফি কমিয়ে ৩০০ টাকা থেকে ৫০ টাকা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

৮ আগস্ট পর্যন্ত আক্রান্ত ১৮ হাজার ৬৭৩, মৃত্যু ৫৯

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৬৭৩ জন। এ সময় পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের।

আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের হার ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নারী ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ তরুণ ও শিশু-কিশোরসহ ৩০ বছর বয়সের মধ্যে। শূন্য থেকে ৩০ বছর বয়সী আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৮২৭ জন। এ বয়সী রোগীদের মধ্যে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুতে ২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

গত বছরের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু কম

চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সঙ্গে ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনা করলে দেখা যায়, এ বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম।

২০২৫ সালের ৮ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ২৩ হাজার ৪১০ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল ৯৫ জনের। বিপরীতে চলতি বছরের একই সময় পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ হাজার ৬৭৩ এবং মৃত্যু ৫৯ জন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম হলেও বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

ডেঙ্গু শনাক্তে দেরি না করার পরামর্শ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এ জন্য ঘরবাড়ি ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

তার মতে, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, এয়ার কন্ডিশনার ও ফ্রিজের নিচের ট্রেসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত এসব স্থান পরীক্ষা করে পানি অপসারণ করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু হলে উচ্চমাত্রার জ্বর দেখা দিতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বরের সময় রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা দিতে হবে। জ্বরের মাত্রা বাড়লে কিংবা ডেঙ্গুর অন্যান্য লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, এক-দুই দিনের জ্বর হলেও ডেঙ্গু পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় জ্বরের রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় দেশের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে অতিরিক্ত শয্যা এবং পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতিও রয়েছে।

শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

এ বছর শিশুদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রবণতা বিশেষভাবে নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। স্কুলগামী শিশুদের নিয়মিত মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা, বাড়ি ও বিদ্যালয়ের আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলা শুধু হাসপাতাল বা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস—এই তিনটি বিষয়েই সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন