বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

তুরস্কের ‘ইলদিরিমহান’ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নতুন বার্তা

তুরস্ক ৬ হাজার কিলোমিটার পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) ‘ইলদিরিমহান’-এর প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে। ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত SAHA 2026 ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এক্সিবিশনে মঙ্গলবার এ ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র এটি তৈরি করেছে।

তুর্কি ভাষায় ‘ইলদিরিমহান’ শব্দের অর্থ ‘বজ্রপাত’। ক্ষেপণাস্ত্রটির সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২৫ এবং এতে চারটি রকেট প্রপালশন ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়েছে। এটি ৩ হাজার কেজি ওয়ারহেড বহনে সক্ষম বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।

বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের জন্য শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং এমন প্রযুক্তি তৈরি করার সক্ষমতা অর্জনই সবচেয়ে বড় বার্তা।

‘ইলদিরিমহান’ দিয়ে ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকায় আঘাত হানতে সক্ষম হবে তুরস্ক

তুরস্কের নতুন উন্মোচিত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ইলদিরিমহান’ ৬ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে আইসিবিএম হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুরস্ক থেকে উৎক্ষেপণ করলে এই ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বহু অঞ্চলে পৌঁছাতে পারবে। যদিও এখনো এর উৎপাদন শুরু হয়নি এবং এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক বুরাক ইলদিরিম বলেন, এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং তুরস্কের ভবিষ্যৎ কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঘোষণা।

ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার মধ্যেই তুরস্কের আইসিবিএম উন্মোচন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তুরস্ক নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনই আঙ্কারাকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে উৎসাহিত করছে।

গত মার্চে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের সময় তুরস্ক দাবি করেছিল, ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির দিকে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। যদিও তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

একই সময়ে ইসরাইলের বিভিন্ন রাজনীতিক তুরস্ককে ‘নতুন হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় আঙ্কারা ও তেলআবিবের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

‘স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা শক্তি’ গড়তে বড় পদক্ষেপ তুরস্কের

বিদেশি অস্ত্রনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে তুরস্ক। নতুন আইসিবিএম ‘ইলদিরিমহান’ সেই পরিকল্পনারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের বলেন, “তুরস্ক এখন শুধু অস্ত্র নয়, প্রযুক্তি ও টেকসই নিরাপত্তা অর্থনীতিও তার মিত্রদের দিতে প্রস্তুত।”

বর্তমানে দেশটিতে হাজারো প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ২০২৫ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ খাতের রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

তুরস্কের আইসিবিএম প্রকল্পে মহাকাশ কর্মসূচিরও ইঙ্গিত

বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইলদিরিমহান’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প শুধু সামরিক শক্তি নয়, তুরস্কের মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক বুরাক ইলদিরিম বলেন, কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠানো এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির মধ্যে বৈজ্ঞানিক মিল রয়েছে। ফলে এ প্রকল্প ভবিষ্যতে তুরস্কের নিজস্ব রকেট প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়ক হবে।

তিনি বলেন, “এটি এখনো ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি তুরস্কের বৈশ্বিক শক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।”

ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী নিয়ে শক্ত অবস্থানে তুরস্ক

তুরস্ক বর্তমানে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থায়ী সেনাবাহিনীর অধিকারী। একই সঙ্গে দেশটি দ্রুত অস্ত্র রপ্তানিকারক রাষ্ট্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করছে।

বিশেষ করে ‘বায়রাকতার টিবি-টু’ ড্রোন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশ তুরস্কের প্রধান অস্ত্র ক্রেতা।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইসিবিএম প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্ক স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক কৌশলগত শক্তি হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন