বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

পশ্চিমা বর্ণনাকে চ্যালেঞ্জ করেছে ইরানে যা দেখেছি: মার্কিন সাংবাদিক

তেহরান টাইমসকে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট Christopher Helali বলেছেন, ইরান সফরে গিয়ে তিনি যে বাস্তবতা দেখেছেন, তা পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রচলিত বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা কল্পনারও বাইরে। তিনি Shahid Beheshti University, Sharif University of Technology, Pasteur Institute of Iran এবং Gandhi Hospital-এ হামলার চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর ভাষায়, অনেক স্থাপনা “সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন” হয়ে গেছে।

হেলালি বলেন, উর্বরতা চিকিৎসা কেন্দ্র, ভ্যাকসিন গবেষণাগার ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হওয়া থেকে বোঝা যায়, হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনা ছিল না। তিনি এই আগ্রাসনকে “নির্মম ও বর্বর” বলে অভিহিত করেন।

তবে ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও তিনি ইরানি জনগণের মধ্যে শক্তিশালী সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক সহমর্মিতা দেখেছেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমা গণমাধ্যমে যেভাবে হামলার পর ইরানে সামাজিক অস্থিতিশীলতা বা বিশৃঙ্খলার ধারণা তুলে ধরা হয়, বাস্তবে তিনি তার উল্টো চিত্র দেখেছেন। মানুষ একে অপরকে সাহায্য করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং কোথাও ব্যাপক লুটপাট বা সহিংসতা দেখা যায়নি।

হেলালি বলেন, মিনাবের স্কুলে হামলার ঘটনায় তিনি নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এক দাদা তাঁর মেয়ে ও নাতনিকে উদ্ধার করতে গিয়ে তাঁদের হারানোর বেদনাময় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সাংবাদিকের ভাষায়, “এটি কোনো সাধারণ হামলা ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের গণহত্যা।”

তিনি আরও বলেন, তেহরান ও ইসফাহানের বিভিন্ন এলাকায় হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝেছেন, সাধারণ মানুষ এই সহিংসতায় গভীরভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক স্থাপনা, আবাসিক ভবন ও বেসামরিক এলাকায় হামলা তাঁদের নাড়িয়ে দিয়েছে।

ইসফাহানে ধ্বংস হওয়া একটি মার্কিন সামরিক বিমানের ধ্বংসাবশেষও পরিদর্শন করেন হেলালি। তাঁর মতে, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি বড় ব্যর্থতা। তিনি ১৯৮০ সালের Operation Eagle Claw-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ইরানে মার্কিন বিশেষ সামরিক অভিযান আবারও ব্যর্থ হয়েছে।

ধ্বংসাবশেষের মধ্যে তিনি সি-১৩০ বিমান, বিশেষ অভিযানের হেলিকপ্টার ও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের অংশ দেখতে পান। তিনি বলেন, স্থানীয় মানুষ ঘটনাটিকে ইরানের বিজয় হিসেবে দেখছেন এবং সেখানে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল।

হরমুজ প্রণালি সফর প্রসঙ্গে হেলালি বলেন, সেখানে সামরিক উপস্থিতি স্পষ্ট হলেও দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “সবকিছু সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত মনে হয়েছে।” তিনি বলেন, ইরান তার আঞ্চলিক জলসীমার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং সেখানে বিশৃঙ্খলার কোনো চিহ্ন তিনি দেখেননি।

পশ্চিমা দর্শকদের উদ্দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কী—এ প্রশ্নের জবাবে হেলালি বলেন, পশ্চিমা বিশ্ব এখনো বুঝতে পারেনি যে ইরানিদের জাতীয় চেতনায় ঐতিহাসিক প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম কত গভীরভাবে প্রোথিত।

তিনি বলেন, ইরানিরা অর্থ বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, নিজেদের দেশ ও মর্যাদার জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত। তাঁর মতে, পশ্চিমা শক্তিগুলো বারবার ভুলভাবে ধরে নিয়েছে যে নেতৃত্ব, অবকাঠামো বা সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করলেই ইরান ভেঙে পড়বে।

হেলালি বলেন, “ইরানের শক্তি তার জনগণের মর্যাদা, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও প্রতিরোধের চেতনায় নিহিত। যতদিন এটি বোঝা না যাবে, ততদিন ইরানকে দমনের সব কৌশলই ব্যর্থ হবে।”


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন