বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

আইএমএফের নতুন ঋণচেষ্টা ঘিরে আলোচনা, বাড়ছে সংস্কার ও জনচাপের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচিতে জটিলতা কাটেনি এখনো। এর মধ্যেই নতুন করে প্রায় ২০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগ অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক-এর কাছ থেকেও প্রায় ১০০ কোটি ডলার সহায়তা চাওয়ার খবর সামনে এসেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী-এর ওয়াশিংটন সফরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে নতুন ঋণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে পর্দার আড়ালে আলোচনা এগোচ্ছে বলে আভাস মিলছে।

পুরোনো কিস্তি আটকে, নতুন ঋণচেষ্টা কেন?

বাংলাদেশ ২০২৩ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করেছিল। পরে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঋণের পরিমাণ আরও ৮০ কোটি ডলার বাড়ানো হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় করেছে আইএমএফ।

তবে ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার এখনো আটকে রয়েছে। মূলত ব্যাংক খাত সংস্কার, ভর্তুকি হ্রাস, রাজস্ব সংস্কার ও কর কাঠামো পরিবর্তনসহ বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এখন সরকার নতুন ঋণের আলোচনা শুরু করায় প্রশ্ন উঠেছে—চলমান কর্মসূচির শর্ত পূরণ না করেই নতুন সহায়তা কীভাবে সম্ভব হবে?

ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি চাপ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, ইরান-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় চাপ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের ওপর।

সরকার এই অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যয় করতে চাইছে না। কারণ এতে আমদানি সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধ এবং টাকার বিনিময় হার আরও চাপে পড়তে পারে। ফলে বিকল্প হিসেবে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় সংস্থার কাছ থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার চিন্তা সামনে এসেছে।

আইএমএফের শর্ত কি আরও কঠিন হবে?

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, নতুন ঋণ পেলেও আইএমএফ আগের সংস্কার শর্তগুলো থেকেই সরে আসবে না। বরং ভর্তুকি কমানো, জ্বালানির দাম সমন্বয়, কর ছাড় বাতিল, ব্যাংক খাত সংস্কার ও রাজস্ব বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে আরও জোর দিতে পারে সংস্থাটি।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “ভর্তুকি কমানো বা কর বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে। আবার ঋণ না নিলে রিজার্ভে চাপ বাড়বে। সরকারকে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, চলমান ঋণ কর্মসূচির সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান কী—আইএমএফ সম্ভবত সেটিই আগে জানতে চাইবে।

ব্যাংক সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে ব্যাংক খাত সংস্কার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ পরবর্তীতে সংশোধন করে সংসদে পাস করা হয়েছে, যা নিয়ে আপত্তি রয়েছে অর্থনীতিবিদদের।

তাঁদের মতে, সংশোধিত আইনের ফলে দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো মালিকপক্ষ আবারও নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যকে দুর্বল করেছে।

জুনে ঢাকায় আসতে পারে আইএমএফ প্রতিনিধি দল

কর্মকর্তাদের ধারণা, জুনে জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে। বাজেটে সংস্কারমূলক পদক্ষেপের প্রতিফলন দেখা গেলে ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।

মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আগের শর্তগুলো পূরণ না করে নতুন ঋণ পাওয়া সহজ হবে না। তাই প্রথমে আটকে থাকা কিস্তির জটিলতা সমাধান জরুরি।”

সরকারের অবস্থান

ওয়াশিংটন সফর শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আইএমএফের কোনো শর্ত যদি জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, সরকার সেটি মেনে নেবে না।”

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আইএমএফের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে শেষ পর্যন্ত সংস্কার ও জনস্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতেই হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন