মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৮ মাসের কঠোর পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

ব্যাংক খাতের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ১৮ মাসের একটি কঠোর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরিকল্পনার প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হবে। পরবর্তী ১২ মাসে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ এবং সংশোধিত ‘মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আইন দুটির মাধ্যমে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলা সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রয়েছে।

গত ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এ পরিকল্পনা তুলে ধরেন বলে সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে।

কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে মুদ্রানীতি পর্যালোচনার সময় ছয় মাসের পরিবর্তে তিন মাস করার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠন করা ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পান, সে বিষয়ে নজরদারি জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি খেলাপি গ্রাহকদের ‘সেফ এক্সিট’ সুবিধার সময় বাড়ানো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। 

মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।

এর আগে গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

কার্যপত্রে বলা হয়েছে, ওই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) ব্যবস্থাপনায় ১৮ মাসের একটি কাঠামো গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে সমঝোতার সুযোগ থাকবে। পরবর্তী ১২ মাসে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট এবং সংশোধিত মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট প্রণয়নের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী বা আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের কাছে ২৩ আগস্ট এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট এবং সংশোধিত মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। শিগগিরই আইন দুটি চূড়ান্ত হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে। কোনো কোনো ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে সুদহারও কমছে না। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলো শেয়ারহোল্ডারদের কম মুনাফা দিচ্ছে এবং সরকারও কম রাজস্ব পাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার পরামর্শও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইএমএফ খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার শর্ত দিলেও পরে সে শর্ত থেকে সরে আসে। তবে খেলাপি ঋণ কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে সংস্থাটি। এ কারণে খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত ২ লাখ ২২ হাজার ৩৪১টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৭ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোকে তাদের খেলাপি গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঋণ আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রণয়নের পর ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করবে।”

ওই সভায় কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম বলেন, খেলাপি ঋণের জন্য শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, ঋণ অনুমোদনকারী পরিচালকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে।

কমিটির আরেক সদস্য চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন এবং ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন ব্যাংকিং খাতে কমপ্লায়েন্স ও ডিউ ডিলিজেন্স কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন। তারা খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ারও পরামর্শ দেন।

ওই সভায় তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাস পরপর মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে—জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর, এই দুই মেয়াদে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছয়টি মূল দায়িত্বের মধ্যে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অন্যতম। মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান জানান, গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদের হার বাড়ালেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। তবে মুদ্রানীতির মাধ্যমে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ ও বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, “নীতি সুদের হার চাহিদার দিক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হলেও সরবরাহের দিক নিয়ন্ত্রণে সরকারের অন্যান্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই উভয় পক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে নীতি সুদভিত্তিক মুদ্রানীতির বা ইন্টারেস্ট রেট টার্গেটিংয়ের দিকে এগোচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক মানিটারি টার্গেটিংভিত্তিক মুদ্রানীতি করত।”

সভায় কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি করার প্রস্তাব করেন। তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রীর অধীনে ছয় সদস্যের মনিটরিং পলিসি অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি কমিটির মতো বাংলাদেশেও একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।

লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, বর্তমান মুদ্রানীতিতে সুদের হার না কমানো হতাশাজনক। উচ্চ সুদের হার ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় বাধা।

চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন বলেন, সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি থেকে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতির দিকে যেতে হবে। এ জন্য সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সীমাবদ্ধতা দূর করার উদ্যোগও নিতে হবে।

আরেক সদস্য জয়নুল আবেদীন বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের ৩০ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক হলেও মুদ্রানীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে মুদ্রানীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংকে আরও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। তিনিও ছয় মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি করার প্রস্তাব দেন।

সভায় গভর্নর জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে সদস্যরা বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ কোনো অবস্থাতেই অনুৎপাদনশীল খাত, ট্রেডিং কার্যক্রম বা খেলাপি ঋণের পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহার করা উচিত নয়।

বন্ধ ও স্থবির শিল্পকারখানা সচল করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এ তহবিল থেকে বন্ধ ও সংকটে থাকা শিল্পকারখানা, কৃষি ও গ্রামীণ খাত এবং সিএমএসএমই খাতে স্বল্প সুদে অর্থায়ন করার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহক এ তহবিল থেকে ঋণের আবেদন করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৩৮টি ব্যাংক ইতোমধ্যে এ তহবিল থেকে ঋণ বিতরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ তহবিল অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বলেন, অতীতেও এ ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার সুফল দেশের অর্থনীতি পায়নি।

কমিটির সদস্য মঈনুল ইসলাম বলেন, কোন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর ভূমিকা কীভাবে পর্যালোচনা করা হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

অন্যান্য সদস্যও এ তহবিলের কঠোর মনিটরিংয়ের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, কোনোভাবেই যাতে তহবিলের অর্থ অপব্যবহার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ পর্যায়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সভাকে জানান, ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। বড় গ্রুপের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং তহবিলের অপব্যবহার রোধে নিবিড় তদারকি করা হবে।

বৈঠকে ‘সেফ এক্সিট’ সুবিধার মেয়াদ আগামী ৩০ ডিসেম্বরের পরিবর্তে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো, নীতি সুদের হার কমানো এবং ঋণের কার্যকর সুদহার কমানোর সুপারিশ করা হয়।

সূএ; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্স


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন