অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

হর্ন অব আফ্রিকা ও লোহিত সাগর ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে বাড়ছে সমন্বয়ের চেষ্টা

মিসরের রাজধানী কায়রোতে মিসর, সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধির মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বৈঠকগুলো হর্ন অব আফ্রিকা ও লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও বৈঠকগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই ছিল আলোচনার মূল বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইথিওপিয়ার সমুদ্রপথে প্রবেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ে চলমান উদ্বেগ এবং অঞ্চলজুড়ে পরিবর্তিত কৌশলগত সম্পর্ক—এসব বিষয় এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। ফলে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতি নিয়ে নতুন ধরনের সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

মিসরের জন্য ইথিওপিয়াকে ঘিরে উদ্বেগ শুধু নীলনদের পানিবণ্টন বা গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (GERD) প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইথিওপিয়ার আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি, সমুদ্রে প্রবেশাধিকার অর্জনের প্রচেষ্টা এবং হর্ন অব আফ্রিকায় সক্রিয় ভূমিকা কায়রোর নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিসর এখন লোহিত সাগরকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করছে। কারণ এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা সুয়েজ খাল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক যোগাযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

অন্যদিকে, সোমালিয়ার ভূ-কৌশলগত অবস্থান তাকে এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালীর নিকটবর্তী অবস্থান এবং ইথিওপিয়ার সমুদ্রপথে প্রবেশের প্রচেষ্টা নিয়ে দুই দেশের বিরোধ আঞ্চলিক কূটনীতিকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে। সোমালিয়া তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অবস্থান স্পষ্ট রেখেছে, যা তাকে মিসরসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে নিয়ে এসেছে।

ইরিত্রিয়াও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লোহিত সাগর উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে এবং ইথিওপিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের জটিল সম্পর্কের কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক কৌশলগত ভারসাম্যে দেশটির গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।

কায়রোর বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহন করছে। আফ্রিকা বিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বুলুস পৃথক বৈঠকে সোমালিয়া ও ইরিত্রিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সংঘাত নিরসয়ের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াশিংটনের কাছে হর্ন অব আফ্রিকা এখনো সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কায়রোর এই ধারাবাহিক বৈঠক কোনো নতুন সামরিক বা রাজনৈতিক জোট গঠনের ইঙ্গিত নয়। বরং এটি এমন একটি পরামর্শ ও সমন্বয় কাঠামো, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দ্রুত পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান সমন্বয়ের চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে হর্ন অব আফ্রিকা ও লোহিত সাগরকে আলাদা দুটি ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং একটি অভিন্ন কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে দেখা হবে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে আঞ্চলিক সহযোগিতা কতটা শক্তিশালী হয় এবং বাইরের শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি না করে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তার ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন