সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ফি আরোপের প্রস্তাবে ইরানের সংসদীয় কমিটির অনুমোদন

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবার বিপরীতে ফি আদায়ের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটি। তবে প্রস্তাবটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। পূর্ণাঙ্গ পার্লামেন্টসহ আরও কয়েকটি ধাপের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

ইরানের পার্লামেন্টে বর্তমানে ‘হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক একটি খসড়া আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে প্রস্তাবটির ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুমোদন করেছে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি। আগের বৈঠকে অনুচ্ছেদটির পর্যালোচনা স্থগিত রাখা হয়েছিল।

কমিটির মুখপাত্র হাসান কাশকাভি জানিয়েছেন, অনুমোদিত ধারায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও পরিবেশগত সেবা, বিশেষ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ, বিমা, নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সেবার জন্য অর্থ আদায়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে, তাদের কাছ থেকে এসব সেবার ফি নেওয়া যেতে পারে। অর্থ পরিশোধ করতে হবে ইরানি রিয়াল অথবা তেহরান নির্ধারিত অন্য কোনো মুদ্রায়।

আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের অধিকারও খসড়ায়

ইরানের সংসদীয় কমিটির দাবি, প্রস্তাবিত আইন তৈরির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর অধিকার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

কাশকাভির ভাষ্য অনুযায়ী, খসড়ায় আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিবিধানের অধীনে সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক নৌপথে এ ধরনের ফি আরোপের উদ্যোগ কার্যকর হলে এর আইনি ভিত্তি, প্রয়োগের পরিধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ এই নৌপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।

ফলে হরমুজে নৌচলাচলে বাধা, বাড়তি ব্যয় কিংবা নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেল-গ্যাসের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলের শর্ত নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। তেহরান প্রণালিতে নিজের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতার ওপর জোর দেয়।

এখনো আইনে পরিণত হয়নি

সংসদীয় কমিটির অনুমোদনের ফলে জাহাজ থেকে ফি আদায় এখনই শুরু হচ্ছে না। ইরানের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রস্তাবটির সামনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে।

কমিটির পর্যালোচনা শেষ হলে প্রতিবেদন পূর্ণাঙ্গ পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে খসড়ার পৃথক ধারা এবং পুরো বিল নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটি হবে।

পার্লামেন্টে অনুমোদন পেলে বিলটি যাবে গার্ডিয়ান কাউন্সিলে। সংস্থাটি প্রস্তাবিত আইন ইরানের সংবিধান ও ইসলামি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করবে।

গার্ডিয়ান কাউন্সিল আপত্তি জানালে বিলটি সংশোধনের জন্য আবার পার্লামেন্টে পাঠানো হতে পারে। পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে মতপার্থক্য নিরসন না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জারি হলে তা কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হবে।

ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ইরান নতুন ফি আরোপ করছে—এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং দেশটির আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন