শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ৫

আহত অন্তত ২৩, ক্ষতিগ্রস্ত শিশু হাসপাতাল ও আবাসিক ভবন; রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানীতে বড় হামলা

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) মধ্যরাতের পর চালানো এ হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন। হামলায় আবাসিক ভবন, একটি শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরের একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বিঘ্নিত হয়েছে।

রাতের নীরবতা ভেঙে কিয়েভের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবন কেঁপে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরে যায়। হামলার সময় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করতে সতর্ক করে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকোসহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হতাহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ধসে পড়ে আবাসিক ভবনের অংশ

হামলায় কিয়েভের সোলোমিয়ানস্কি, সভিয়াতোশিনস্কিসহ একাধিক জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সোলোমিয়ানস্কি এলাকায় একটি নয়তলা আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে আগুন ধরে যায়। বিভিন্ন আবাসিক ভবনে মানুষ আটকা পড়ার খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে।

হামলায় গুদাম ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনাতেও আগুন লাগে। জরুরি বিভাগের কর্মীরা রাত থেকেই আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া ব্যক্তিদের সন্ধানে অভিযান চালান।

ক্ষতিগ্রস্ত শিশু হাসপাতাল

রুশ হামলায় কিয়েভের একটি শিশু হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের আঘাতে হাসপাতালের জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং হাসপাতাল চত্বরে থাকা কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরে যায়।

আবাসিক ও চিকিৎসাসেবা স্থাপনায় হামলার ঘটনায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে তিনজনের মৃত্যু ও ২০ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন কিয়েভের মেয়র। পরে উদ্ধার অভিযান এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। সর্বশেষ হিসাবে অন্তত পাঁচজন নিহত ও ২৩ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে কিয়েভের সামরিক প্রশাসন।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সতর্কতা

হামলার সময় ইউক্রেনের বিমানবাহিনী রাজধানীর দিকে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আসার সতর্কতা জারি করে। একই সময়ে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চল থেকে জিরকন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণেরও সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল।

একের পর এক বিস্ফোরণের মধ্যে কিয়েভের বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করতে বলা হয়। হামলার পর শহরের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

রাশিয়া বা ইউক্রেনের পক্ষ থেকে হামলায় ব্যবহৃত সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই বড় হামলা

কিয়েভে সর্বশেষ এই হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে।

এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের পার্লামেন্ট নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ইয়েভহেনি খমারার নিয়োগ অনুমোদন করে। তার পক্ষে ভোট দেন ৩১২ জন আইনপ্রণেতা।

খমারা ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। সংস্থাটির বিশেষ অভিযান ইউনিট ‘আলফা’র নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।

নিয়োগ অনুমোদনের আগে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা এবং রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্বাচন দাবি

ইউক্রেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ। জুলাইয়ে তাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় যুদ্ধ চলাকালেই নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ইউক্রেন বর্তমানে ‘শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত সংকটের’ মুখোমুখি বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই মন্ত্রী।

তার এই অবস্থানের সমর্থনে কিয়েভে বিক্ষোভও হয়েছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে বাস্তবে একটি অবাধ ও কার্যকর নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে দেশটির ভেতরেই বিতর্ক রয়েছে।

সামরিক আইনে নির্বাচন স্থগিত

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক আইন কার্যকর রয়েছে। বর্তমান আইনে সামরিক আইন চলাকালে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ নেই।

প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নিয়মিত মেয়াদ ২০২৪ সালের মে মাসে শেষ হলেও সামরিক আইন অব্যাহত থাকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

ফলে একদিকে রাশিয়ার অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে নির্বাচন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক—দুই ধরনের চাপই মোকাবিলা করছে কিয়েভ।

সর্বশেষ হামলায় রাজধানীর আবাসিক এলাকা ও শিশু হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন