রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

‘মানুষের সেবা বড় আমানত, দায়িত্বশীল ও মানবিকভাবে কাজ করুন’: ইউএনওদের প্রধানমন্ত্রী

আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে মাঠ প্রশাসনকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান

ঢাকা, ৮ আগস্ট ২০২৬:
দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মানুষের সেবা করার সুযোগ একটি বড় আমানত ও আল্লাহর নিয়ামত। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ইউএনওদের উদ্দেশে আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ সভার বক্তব্যের বিষয়টি জানান।

‘আজ আমরা আছি, কাল থাকব না’

সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব হলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যাওয়া।

তিনি বলেন, ‘আজ আমরা আছি, কাল থাকব না। আসুন, আমরা সবাই মিলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করি, যেখানে সবাই একটু ভালো থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে কাজ করলে রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে এবং সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবেন।

‘প্রতিটি মানুষকে নিজের মানুষ মনে করে কাজ করতে হবে’

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের সঙ্গে সরকারের সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, একজন ইউএনও যে উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন, সেটি হয়তো তাঁর নিজের উপজেলা নয়; কিন্তু সেটি বাংলাদেশেরই একটি অংশ।

সেখানে বসবাসকারী মানুষদেরও নিজের এলাকার মানুষের মতো আপন মনে করে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করাও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সচেতনতার মাধ্যমে অনেক সামাজিক সমস্যা সমাধান সম্ভব

শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, মানুষকে বোঝানো, সচেতন করা এবং সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ইউএনওদের নিজ নিজ এলাকায় জনসচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগাতে উৎসাহ দেওয়ার আহ্বান

পরিবেশ রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দূষণের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর তালিকায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এটিকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।

স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা ও পৌরসভাগুলোতে অনেক মানুষ নিজেদের উদ্যোগে গাছ লাগাতে চান। সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের উৎসাহিত করলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ আরও বহুগুণ বাড়তে পারে।

তাঁর মতে, একজন মানুষকে ১০টি গাছ লাগাতে উৎসাহিত করা গেলে তিনি হয়তো ৫০টি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। এভাবেই সম্মিলিত উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় বড় অবদান রাখতে পারে।

খেলাধুলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান

তরুণদের সুস্থ ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে খেলাধুলার প্রসারেও ইউএনওদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনকে উৎসাহিত করলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে ওঠে।

তাই উপজেলা পর্যায়ে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি, স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে উৎসাহ দেওয়া এবং তরুণদের মাঠমুখী করার উদ্যোগ নিতে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

পর্যায়ক্রমে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা

সভায় দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি জানান, সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মতে, খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।

স্থানীয় পর্যায়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরত দেওয়া ৮৩ ইউএনওকে প্রশংসা

সভায় খাল খনন প্রকল্পে নির্ধারিত অর্থের মধ্যে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া ৮৩ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রসঙ্গ উঠে আসে।

সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং অব্যবহৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিকে দায়িত্বশীলতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় সাশ্রয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্বও সভায় তুলে ধরা হয়।

উপস্থিত ছিলেন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা

সভায় প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় দেশের বিভিন্ন উপজেলার ইউএনওরা অংশ নেন।

মানুষের আস্থা অর্জনই মাঠ প্রশাসনের বড় দায়িত্ব

সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে মানবিকতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জনসচেতনতা, খেলাধুলার প্রসার এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখাও এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি সততা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে সরকারের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও সহজ হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন