রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমিত করার উদ্যোগ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংসদের দুই কক্ষের মধ্যে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা

ঢাকা, ৮ আগস্ট ২০২৬:
ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত সরকার যাতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমিত করার বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঠেকাতে সাংবিধানিক সংস্কার

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও সেই সরকার যেন পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় পরিণত হতে না পারে, সে জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রয়োজন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় একই ব্যক্তি বা সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মেয়াদের সীমা নির্ধারণ করা হলে ক্ষমতার নিয়মিত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে নতুনদের অংশগ্রহণের পথও উন্মুক্ত হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সে লক্ষ্যেই সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার বিধান সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংসদের দুই কক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্য

রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় শুধু একটি কক্ষের হাতে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পুরো নিয়ন্ত্রণ না রেখে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। এর ফলে একটি কক্ষের সিদ্ধান্ত অন্য কক্ষের পর্যালোচনা ও যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এ ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন প্রত্যাশা

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের জনগণের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সেই জনআকাঙ্ক্ষাকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিফলিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানও সময়ের সঙ্গে জনগণের প্রয়োজন, রাষ্ট্রের বাস্তবতা এবং গণতান্ত্রিক চাহিদা অনুযায়ী সংস্কার করা যেতে পারে। তবে এসব পরিবর্তন অবশ্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে করতে হবে।

বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্রের উদাহরণ

বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সময়ের প্রয়োজনে তাদের সংবিধানে পরিবর্তন এনেছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো সংবিধানই স্থির বা অপরিবর্তনীয় নয়। সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রত্যাশার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবিধানিক কাঠামোতেও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশাকে বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সংস্কারের লক্ষ্য জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রস্তাবিত সংস্কারের মূল লক্ষ্য হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রোধ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি এবং নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করার পাশাপাশি সংসদের দুই কক্ষের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর পরিবর্তন, উচ্চকক্ষের কাঠামো এবং দুই কক্ষের ক্ষমতার পরিধি কী হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা পরবর্তী পর্যায়ে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

‘নির্বাচনই শুধু গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মতে, নিয়মিত নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর কার্যকর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ থাকাও জরুরি।

এ কারণে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার বিভাজন, পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ, সংসদীয় জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সংস্কার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ, সংসদের কাঠামো এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর আইনসভার নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় তাই তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে জাতীয় বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন