সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত

তিন দিনের ঢাকা সফর শেষে বিশেষ দূত সার্জিও গরের আশাবাদ; রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তিন দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং উন্নয়ন সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস সফর-পরবর্তী এক বিবৃতিতে জানায়, ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সফর দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্কের গভীরতা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

সফরকালে সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এছাড়া তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে সার্জিও গর বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার এবং এ ক্ষেত্রে উভয় দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রকে গুদামজাতকরণ অবকাঠামো, সয়াবিন, তুলা, গম এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এসব খাতে বিনিয়োগ বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াবে।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (DFC)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়। সার্জিও গর জানান, এ সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে ওয়াশিংটন ইতিবাচকভাবে কাজ করছে।

বিনিয়োগ সম্মেলনের উদ্যোগ

সার্জিও গর জানান, বাংলাদেশে কার্যরত মার্কিন বিনিয়োগকারীরা একটি ‘ইউএস ইনভেস্টরস সামিট’ আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি আগামী মাসে ইউএস–বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল-এর একটি প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA)-এর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, সংস্থাটি বাংলাদেশে পুনরায় পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে আস্থার ইঙ্গিত

বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে সার্জিও গর বলেন, এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ভ্রমণসংক্রান্ত সতর্কতার মাত্রা লেভেল-৩ থেকে লেভেল-২-এ নামিয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা আস্থার প্রতিফলন এবং এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।

রোহিঙ্গা সংকটে সহযোগিতা অব্যাহত

কক্সবাজার সফরকালে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনের পর সার্জিও গর বাংলাদেশ সরকারের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এক মিলিয়নেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবিক দায়িত্ব পালন করছে।

তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে এবং অন্যান্য দেশকেও তাদের অবদান বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সংকটের দ্রুত, টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধানে আসিয়ান, প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার বড় অংশ প্রদান করায় যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা

সফরের অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, অভিবাসন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে এবং উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী।

তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্পষ্ট করেন, বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন বা ভারতের সম্পর্ক নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। একইভাবে মিয়ানমারে মানবিক করিডোর স্থাপনসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে—এমন দাবিও তিনি নাকচ করেন।

মার্কিন দূতাবাসের মতে, সার্জিও গরের এই সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানবিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন