অনুসরণ করুন:
রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬

মিরপুরে রাকিব হোসেন হত্যা: শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, ৪৯ জনের অব্যাহতির সুপারিশ

রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাকিব হোসেন (২৯) নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সঙ্গে প্রাথমিকভাবে নাম থাকা আরও ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মমিনুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তদন্ত শেষে তিনি আদালতকে জানান, সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মতো উপাদান পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, কয়েকজন ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সমর্থনে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে ৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার, সাবেক ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, কামাল আহমেদ মজুমদার, ইলিয়াস মোল্লা, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, এখলাস উদ্দিন মোল্লা এবং সাবেক কাউন্সিলর কাসেম মোল্লাসহ আরও অনেকে।

অন্যদিকে, অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান, কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আরেফিন, পাবনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গালিবুর রহমান শরিফ, আলোক হেলথকেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেন এবং ব্যবসায়ী ইলিয়াস আহমেদ তালুকদার।

অভিযোগপত্রে তদন্তের পর্যবেক্ষণ

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি নিয়ে উচ্চ আদালতের রায়ের পর দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় এবং তা পর্যায়ক্রমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হয়। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, আন্দোলন প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন নির্দেশনা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা মত দিয়েছেন।

কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের উদ্যোগ ব্যর্থ

তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের অনুমতি নিয়ে নিহত রাকিব হোসেনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তির কারণে মরদেহ উত্তোলন সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি মিছিল মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পৌঁছালে সেখানে গুলির ঘটনা ঘটে। এতে রাকিব হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতের বাবা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক্ক ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় এসে মরদেহ নিজ জেলায় নিয়ে যান। সে সময়কার পরিস্থিতির কারণে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। পরে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

বাবার প্রত্যাশা

নিহত রাকিব হোসেনের বাবা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক্ক জানান, তার ছেলে ২০২১ সালে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

প্রসঙ্গত, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হওয়া মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। অভিযোগপত্র গ্রহণ, অভিযোগ গঠন এবং বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালতের রায়ের মাধ্যমেই আসামিদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারিত হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন