পাকিস্তজুড়ে চলমান মৌসুমি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশটির প্রধান দুই জলাধার টারবেলা ও মাংলা বাঁধে গত দুই সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য হারে পানি বেড়েছে। একই সঙ্গে সিন্ধু (ইন্দুস) নদীর বিভিন্ন অংশে মাঝারি মাত্রার বন্যা পরিস্থিতি বজায় থাকায় দেশটির আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নতুন করে বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং নগর জলাবদ্ধতার সতর্কতা জারি করেছে।
দেশটির পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (WAPDA), বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ (FFD) এবং পাঞ্জাব প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (PDMA)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টানা বর্ষণ এবং উজানের জলাধার এলাকায় অতিবৃষ্টির ফলে নদী ও বাঁধগুলোর পানির স্তর দ্রুত বাড়ছে।
টারবেলা বাঁধে দুই সপ্তাহে ৩২ ফুটের বেশি পানি বৃদ্ধি
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই টারবেলা বাঁধের পানির উচ্চতা ছিল ১,৫০৪.৩১ ফুট, যা ৩১ জুলাই বেড়ে ১,৫৩৭ ফুটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র ১৫ দিনে পানির উচ্চতা বেড়েছে ৩২.৬৯ ফুট।
বর্তমানে বাঁধটি তার সর্বোচ্চ সংরক্ষণ সক্ষমতা ১,৫৫০ ফুটের মাত্র ১৩ ফুট নিচে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাধারের উজানে অব্যাহত ভারী বৃষ্টি এবং হিমবাহ গলার পানি—উভয়ই টারবেলা বাঁধে পানির প্রবাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
মাংলা বাঁধেও দ্রুত বাড়ছে পানি
একই সময়ে মাংলা বাঁধের পানির উচ্চতা ১,১৭৩.২০ ফুট থেকে বেড়ে ১,১৯৫.৫৫ ফুটে পৌঁছেছে। যদিও এটি এখনও বাঁধটির সর্বোচ্চ সংরক্ষণ সীমা ১,২৪২ ফুট থেকে অনেক নিচে রয়েছে, তবুও ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া চাশমা হ্রদের পানির উচ্চতাও ৬৪৬.৮০ ফুট থেকে বেড়ে ৬৪৮.৫০ ফুটে পৌঁছেছে, যা এর ধারণক্ষমতার খুব কাছাকাছি।
ইন্দুস নদীতে মাঝারি বন্যা, কিছু এলাকায় উন্নতির আভাস
বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের তথ্যমতে, গুড্ডু ও সুক্কুর ব্যারাজে সিন্ধু নদীতে মাঝারি মাত্রার বন্যা প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে।
তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুড্ডু এলাকায় পানি কিছুটা কমে নিম্নমাত্রার বন্যায় নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সুক্কুর এলাকায় মাঝারি বন্যা পরিস্থিতি আপাতত বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলাম, রাভি ও শতদ্রু (সুতলেজ) নদীগুলো বর্তমানে নিম্নমাত্রার প্রবাহে রয়েছে।
চেনাব নদীতে পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা
আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, মারালা, খানকি ও কাদিরাবাদ এলাকায় চেনাব নদীর পানি নিম্ন থেকে মাঝারি পর্যায়ে ওঠানামা করতে পারে।
বিশেষ করে মারালা অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে উচ্চমাত্রার বন্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জেলাম, চেনাব ও রাভি অববাহিকার বিভিন্ন পাহাড়ি খাল ও নালায় মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানি প্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও নগর জলাবদ্ধতার সতর্কতা
পাকিস্তানের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, আগামী কয়েক দিনে—
- ডেরা গাজী খান অঞ্চলের পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
- খাইবার পাখতুনখোয়া ও উত্তর বেলুচিস্তানের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।
- রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর, জেলাম, সিয়ালকোট, গুজরানওয়ালা, গুজরাট, নারোয়াল, সারগোধা, মান্দি বাহাউদ্দিন, ওকারা, সাহিওয়াল ও ফয়সালাবাদসহ একাধিক শহরে নগর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।
- একই ধরনের জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে সিন্ধুর বাদিন, হায়দরাবাদ, জামশোরো, খাইরপুর, মাটিয়ারি, মিরপুরখাস, সাংঘার, শহীদ বেনজিরাবাদ, সুজাওয়াল, টান্ডো আল্লাহইয়ার, টান্ডো মোহাম্মদ খান, থারপারকার, থাট্টা ও উমরকোট জেলা।
প্রধান নদীগুলোর বর্তমান প্রবাহ
৩১ জুলাই প্রকাশিত WAPDA-এর তথ্য অনুযায়ী—
- টারবেলা (ইন্দুস নদী): প্রবাহ ২,৪১,০০০ কিউসেক, নির্গমন ১,৮৪,৩০০ কিউসেক।
- মাংলা (জেলাম নদী): প্রবাহ ৪৫,১০০ কিউসেক, নির্গমন ৭,৪০০ কিউসেক।
- মারালা (চেনাব নদী): প্রবাহ ৮০,৬০০ কিউসেক, নির্গমন ৬৬,৫০০ কিউসেক।
পাঞ্জাবে ভারী বর্ষণ অব্যাহত
গত ২৪ ঘণ্টায় পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে—
- আটক: ৭৫ মিমি
- সিয়ালকোট: ৬৭ মিমি
- জোহরাবাদ: ৫৬ মিমি
- লাহোর: ৪৬ মিমি
- সারগোধা: ৪৪ মিমি
- খুশাব: ২৭ মিমি
- মুর্রি: ২১ মিমি
- রাওয়ালপিন্ডি: ১৭ মিমি
- নারোয়াল: ১৫ মিমি
- চিনিওট ও মিয়ানওয়ালি: ৭ মিমি করে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগাম প্রস্তুতি, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কারণে অনেক এলাকায় বড় ধরনের দুর্ভোগ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
৫ আগস্ট পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে
PDMA জানিয়েছে, বর্তমান মৌসুমি বৃষ্টির ধারা ৫ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে নদী, বাঁধ ও ব্যারাজগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে উচ্চ সতর্কতায় থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন জলাধারের পানি ধারণক্ষমতার ব্যবহার হলো—
- টারবেলা: ৮৫%
- মাংলা: ৫৪%
- থেইন: ৪৬%
- পং: ৪০%
- ভাকরা: ৩৭%
বর্ষায় প্রাণহানি বেড়ে ৪৫
পাঞ্জাব প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমি বৃষ্টিতে এ পর্যন্ত ৪৫ জন নিহত এবং ২৭৯ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে—
- ভবন ধসে ৩৩ জন,
- পানিতে ডুবে ৬ জন,
- বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৪ জন,
- বজ্রপাতে ২ জন মারা গেছেন।
আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
জনগণের প্রতি সতর্কবার্তা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের নর্দমা, খাল, নদী বা নিচু এলাকায় গোসল বা খেলাধুলা করতে না দেওয়া এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র: পাকিস্তানের পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (WAPDA), বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ (FFD), পাঞ্জাব প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (PDMA)-এর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।

