শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬

সংযুক্ত পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ মানুষ

বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি ও হারিয়ে যাওয়া মানবিক স্পর্শের দর্শন

বিশেষ নিবন্ধ

পৃথিবী আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। একটি মোবাইল ফোনের পর্দায় বসেই মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তে কথা বলতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগকে এনে দিয়েছে অভূতপূর্ব গতি।

কিন্তু একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে—মানুষ কি সত্যিই আগের চেয়ে বেশি কাছাকাছি এসেছে, নাকি আরও বেশি একা হয়ে পড়েছে?

বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় অর্জন যোগাযোগের বিস্তার। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো মানুষের ভেতরের দূরত্বের বিস্তার। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ বাস্তব সম্পর্কের পরিবর্তে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। ফলে চারপাশে মানুষ থাকলেও অন্তরে জন্ম নিচ্ছে নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া।

একই ছাদের নিচে, ভিন্ন ভিন্ন পৃথিবী

একসময় সন্ধ্যা নামলেই পরিবারের সবাই একত্র হতো। গল্প, হাসি, অভিজ্ঞতা বিনিময় আর একসঙ্গে খাওয়ার মধ্যে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হতো। এখন একই পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থাকলেও প্রত্যেকে আলাদা একটি ডিজিটাল জগতে বাস করেন। কারও চোখ মোবাইলের পর্দায়, কারও মন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কারও সময় ভার্চুয়াল বিনোদনে।

শারীরিক দূরত্ব কমেছে, কিন্তু মানসিক দূরত্ব বেড়েছে।

আজ মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু সত্যিকার অর্থে নিজের কথা বলার মতো মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। হাজারো অনলাইন বন্ধুর মাঝেও অনেকেই গভীর রাতে নিজের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার মতো একজন মানুষ খুঁজে পান না।

সংযোগের ভিড়ে সম্পর্কের সংকট

বিশ্বায়ন মানুষের সামনে অসংখ্য সুযোগ এনে দিয়েছে। শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা, জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান সহজ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারাও বেড়েছে।

আজকের পৃথিবীতে সফলতার সংজ্ঞা প্রায়ই নির্ধারিত হয় আয়, পদ, অনুসারী কিংবা জনপ্রিয়তার মাধ্যমে। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে সম্পর্ককে নয়, অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। ভালোবাসার জায়গা দখল করছে প্রয়োজন; বন্ধুত্বের জায়গা দখল করছে স্বার্থ; আর আত্মীয়তার জায়গা দখল করছে আনুষ্ঠানিকতা।

দর্শনের ভাষায় মানুষ যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে নিজের তৈরি সভ্যতার ভেতর।

একাকিত্ব—নীরব বৈশ্বিক সংকট

মনোবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, একাকিত্ব কেবল একটি অনুভূতি নয়; এটি মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একাকিত্বকে এখন জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

অদ্ভুত বিষয় হলো—এই একাকিত্ব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে সেইসব মানুষের মধ্যে, যারা সারাক্ষণ অন্যদের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত থাকেন।

প্রযুক্তি কি দায়ী?

প্রযুক্তি নিজে কখনোই শত্রু নয়। প্রযুক্তি একটি মাধ্যম, যার ব্যবহারই নির্ধারণ করে তার প্রভাব।

সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে। একটি ভিডিও কল কখনো মায়ের স্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। একটি ইমোজি কখনো বন্ধুর কাঁধে হাত রাখার সমান নয়। শত শত শুভেচ্ছাবার্তা কখনো একটি আন্তরিক সাক্ষাতের উষ্ণতা দিতে পারে না।

মানুষের হৃদয় এখনও মানুষের উপস্থিতিই খোঁজে।

দার্শনিকদের চোখে নিঃসঙ্গতা

পাশ্চাত্যের বহু দার্শনিক মনে করেছেন, মানুষ জন্মগতভাবেই অর্থের সন্ধানী। সে কেবল বেঁচে থাকতে চায় না; সে চায় তার অস্তিত্বের মূল্য খুঁজে পেতে।

যখন জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে সম্পর্ক, মূল্যবোধ ও মানবিকতা না থেকে কেবল প্রতিযোগিতা, ভোগ এবং সাফল্যের হিসাব চলে আসে, তখন মানুষ নিজের মধ্যেই এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করে।

এই শূন্যতা অর্থ দিয়ে পূরণ হয় না, জনপ্রিয়তা দিয়েও নয়।

কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—কেউ তার কথা শুনুক, তাকে বুঝুক, তার আনন্দে হাসুক এবং তার দুঃখে পাশে দাঁড়াক।

ইসলাম কী শিক্ষা দেয়?

ইসলাম মানুষকে একা থাকার ধর্ম নয়; বরং সম্পর্কের ধর্ম।

কুরআন ও সুন্নাহ পরিবার, আত্মীয়তা, প্রতিবেশী, বন্ধু এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, সালামের প্রচলন, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, দান-সদকা, একসঙ্গে নামাজ আদায় এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার শিক্ষা ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের অংশ।

অর্থাৎ ইসলাম এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে নয়, হৃদয়ের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

ফিরে যেতে হবে মানবিকতায়

বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার কোনো সুযোগ নেই, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু প্রযুক্তি যেন সম্পর্কের বিকল্প না হয়ে ওঠে, সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ সর্বাধুনিক যন্ত্র নয়; বরং একসঙ্গে বসে কথা বলার সময়। একটি সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি উঁচু ভবন নয়; বরং মানুষে মানুষে বিশ্বাস। একটি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ।

উপসংহার

মানুষের হাতে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী যোগাযোগ প্রযুক্তি রয়েছে, কিন্তু অনেক মানুষের হৃদয়ে নেই একজন শ্রোতা। হাজারো সংযোগের মাঝেও মানুষ যদি নিজেকে একা অনুভব করে, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি প্রযুক্তির নয়; সম্পর্কের।

হয়তো আমাদের আবার শিখতে হবে—একটি ফোনকলের বদলে একটি সাক্ষাৎ, একটি ইমোজির বদলে একটি হাসি, একটি আনুষ্ঠানিক বার্তার বদলে আন্তরিক কুশল বিনিময় এবং ব্যস্ততার অজুহাতের বদলে কিছুটা সময় উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি।

কারণ পৃথিবীকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করে তোলে ইন্টারনেটের গতি নয়, মানুষের হৃদয়ের উষ্ণতা।

যে দিন মানুষ আবার মানুষকে সময় দেবে, সম্পর্ককে লালন করবে এবং ভালোবাসাকে জীবনের কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে আনবে, সেদিন হয়তো প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের এই যুগেও নিঃসঙ্গতা নয়, মানবিকতাই হবে সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরিচয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন