অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্ভাবন ও বহুমুখী রপ্তানিতেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে হবে: তিতুমীর

২০২৯-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর তাগিদ • ‘রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব • বেসরকারি অর্থায়নে কর সুবিধা বিবেচনার আশ্বাস • ইনোভেশন ফেয়ারের সেরা ১০ দল পেল এক লাখ টাকা করে

উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বহুমুখী রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

সোমবার রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

দেশের অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে তিন ধাপের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন ড. তিতুমীর। এগুলো হলো—অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ।

তিনি বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে একক বা সীমিতসংখ্যক পণ্যের ওপর রপ্তানি নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী রপ্তানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বর্তমান অবস্থান থেকে এগিয়ে যেতে গবেষণা, বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণ এবং প্রযুক্তির ধারাবাহিক উন্নয়নের বিকল্প নেই।

ড. তিতুমীর বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রবর্তিত মুক্তবাজারভিত্তিক শিল্পনীতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে নেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দেশে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতায় একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গবেষণা ও উদ্ভাবনে অর্থায়নের নতুন কাঠামোর কথাও বলেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা। দেশে মানসম্মত গবেষণা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক একটি ‘রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ফান্ড’ গঠনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরির জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান তিনি।

বেসরকারি খাত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ ধরনের তহবিলে অর্থায়ন করলে সরকার কর ছাড়সহ প্রয়োজনীয় রাজস্ব সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলেও জানান ড. তিতুমীর। উদ্ভাবক ও গবেষকদের উৎসাহিত করতে নীতিগত ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

তাঁর মতে, গবেষণাগার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৈরি উদ্ভাবনকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলে তা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বক্তব্যের শেষ দিকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন সামনে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও দক্ষতার বিস্তার এবং তরুণ উদ্ভাবকদের অংশগ্রহণে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রত্যাশার কথা জানান ড. তিতুমীর। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে বাস্তব প্রয়োগে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। দেশে নতুন উদ্ভাবন ও তরুণ মেধা বিকাশে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে ইনোভেশন ফেয়ার আয়োজনের কথাও জানান সচিব।

তিনি বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উদ্ভাবনী ধারণাগুলোকে গবেষণার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে সফল উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার পথ তৈরি করা হচ্ছে।

সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, মেলায় প্রদর্শিত উদ্ভাবনগুলোকে শুধু প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি উদ্ভাবনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং ওমানসহ বিদেশি বাজারেও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে তিনি জানান।

তিন দিনের মেলায় মোট ২০টি অ্যাকাডেমিক, মিডিয়া ও পলিসি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সচিব জানান, ইনোভেশন ফেয়ারে অংশগ্রহণের জন্য পাওয়া ৬৭১টি আবেদন থেকে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মূল্যায়ন ও বাছাইয়ের মাধ্যমে ৫০টি উদ্ভাবনী দলকে চূড়ান্ত প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচন করা হয়।

বিচারকদের মূল্যায়নে এই ৫০টি দলের মধ্য থেকে শীর্ষ ১০ উদ্ভাবন নির্বাচিত হয়। এগুলো হলো—হোমপিটাল নেক্সাস, স্মার্ট হুইলচেয়ার, ফায়ারফ্লাই, ভয়েস অ্যাসিস্ট ডিভাইস, বিডি সাইবার হেল্পলাইন, ওয়াটার রিপেলেন্ট জুট ফেব্রিক, ন্যাচারাল ফাইবার পিসিবি, অ্যানটেনা ফর ন্যানোস্যাট, লিকুইড ট্রি এবং সেলফ কন্টাক্টর। বিজয়ী প্রতিটি উদ্ভাবনী দলকে এক লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়।

মেলায় সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সফল উপস্থাপনার জন্য গাজী এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশকে (এআইইউবি) বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ইনোভেশন ফেয়ারে ৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে শতাধিক স্টল ছিল। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, শিল্প উদ্যোক্তা, গবেষক, উদ্ভাবক ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন