অনুসরণ করুন:
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

শুভেন্দু সরকারের কঠোর অভিযানে সীমান্তে পুশ-ইন বেড়েছে, উদ্বেগে বাংলাদেশ

প্রান্তকাল আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের শনাক্ত ও ফেরত পাঠানোর অভিযান জোরদার হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় যথাযথ পরিচয় যাচাই ও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভারত থেকে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে পাঠানো বা ‘পুশ-ইন’ করার অভিযোগও বাড়ছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।

সর্বশেষ ২৪ জুলাই মেহেরপুরের মুজিবনগর সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবি ওই প্রচেষ্টা প্রতিহত করে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার পাথরঘাটা এলাকা থেকে নাজিরাকোনা সীমান্তের দিকে দলটিকে নিয়ে এসেছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী—বিএসএফ।

এর আগে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন সীমান্তে একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়। কয়েকটি ঘটনায় বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে বিজিবির উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়। তবে বিএসএফ বিভিন্ন সময় পুশ-ইনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত ২৩ জুন রাজ্য বিধানসভায় দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ‘অবৈধ অভিবাসীকে’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আরও প্রায় এক হাজার ৮০০ জনকে রাজ্যের ১২টি হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং তাঁদের সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ক্ষমতা গ্রহণের পর শুভেন্দু সরকার কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ বা ‘শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কার’ নীতি ঘোষণা করে। গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রত্যেক জেলার প্রশাসনকে আটক বিদেশি নাগরিক এবং প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার স্থাপনের নির্দেশ দেয়। শুভেন্দু অধিকারীও ঘোষণা করেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন—সিএএর আওতাভুক্ত নন, এমন অনিবন্ধিত অভিবাসীদের আটক করে ফেরত পাঠানোর জন্য বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

মে মাসের শেষ দিকে শুভেন্দু অধিকারী কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের দ্রুত পশ্চিমবঙ্গ ছাড়ার আহ্বান জানান। তাঁর ওই ঘোষণার পর উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে বহু মানুষ জড়ো হন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে, অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান ভারতের আইন ও সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের অভিযোগ, কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে দাবি করলেই তাঁকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো যায় না। প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং দুই দেশের নির্ধারিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান হচ্ছে, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করলে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে তাঁকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে নিতে আপত্তি নেই; কিন্তু একতরফা পুশ-ইন গ্রহণযোগ্য নয়।

বিজিবির তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ভারত থেকে দুই হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হয়। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন বলে বিজিবির দাবি। চলতি বছরের মে মাস থেকে সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা আবার বেড়েছে।

অন্য একটি হিসাবে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার ৩০৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ঘটনা নথিভুক্ত করেছে বিজিবি। তাঁদের মধ্যে ১২৬ জন ভারতীয় এবং ৩৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন। বিভিন্ন উৎসে সংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অভিযোগের মূল বিষয় হলো—ঠেলে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে সবাই বাংলাদেশি নন এবং বহু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক পরিচয় যাচাই হয়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য বলছে, অবৈধভাবে ভারতে থাকা বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। নয়াদিল্লির দাবি, বাংলাদেশ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের বিরুদ্ধে দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয় হবে

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভারত যাঁদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাঁদের নাম, ঠিকানা ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য নির্ধারিত কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠাতে হবে। যাচাইয়ে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের মাধ্যমে তাঁদের দেশে ফেরানো যেতে পারে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে বা অরক্ষিত সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী, শিশু ও পরিবারসহ মানুষকে পাঠানো মানবিক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত দিয়ে অনিবন্ধিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষকে রাতে সীমান্তের কাছে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য করা হয়েছে এবং পরিবারগুলো নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েছে বলে মানবাধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য জুনে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক নিয়ে যে অভিযোগ ও প্রতিবাদ করছে, তা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেখবে। পররাষ্ট্রনীতি রাজ্য সরকারের বিষয় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই বক্তব্য দেবে। তবে এর আগে তিনি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশনার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা প্রত্যেক দেশের বৈধ অধিকার হলেও কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই না করে তাঁকে অন্য দেশের ভূখণ্ডে পাঠানো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে ভারতীয় নাগরিক বা অন্য দেশের নাগরিক ভুলভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী হওয়া বা মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বাংলাদেশি সন্দেহ করার অভিযোগ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে ভারতের নিজস্ব নাগরিকেরাও হয়রানি, আটক বা দেশছাড়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, অভিযানটি ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং বৈধ নাগরিকত্ব ও আবাসনের কাগজপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তে হত্যা, চোরাচালান, অনুপ্রবেশ ও কাঁটাতারের বেড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগে থেকেই দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এর সঙ্গে একতরফা পুশ-ইনের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠকের পাশাপাশি দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে জরুরি আলোচনা প্রয়োজন। নাগরিকত্ব যাচাই, আটক ব্যক্তিদের তালিকা বিনিময় এবং আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসনের একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি কার্যকর না করা গেলে সীমান্তে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

শুভেন্দু অধিকারীর সরকার অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিকে আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। বিপরীতে বাংলাদেশ বলছে, অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে বিষয়টি এখন শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিজিবির তথ্য


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন