অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

১৮ মাস পর বাংলাদেশে আবারও স্যামসাংয়ের উৎপাদন শুরু, প্রযুক্তি উৎপাদন হাবে রূপান্তরের পথে নতুন অগ্রগতি

প্রায় দেড় বছর বিরতির পর বাংলাদেশে আবারও স্যামসাং ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের শিল্পবান্ধব নীতি, কর-প্রণোদনা এবং স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করার উদ্যোগের ফলে দেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে নতুন গতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমানে নরসিংদীর শিবপুরে ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের কারখানায় স্যামসাং ব্র্যান্ডের রেফ্রিজারেটর উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরে ওয়াশিং মেশিন এবং নভেম্বরে স্মার্টফোন উৎপাদন চালু হবে। এছাড়া ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে তৈরি স্যামসাং স্মার্টফোন বাজারজাত করার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

ফেয়ার গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন জানান, সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত সহায়তা স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার ও কম্প্রেসরের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমানোয় উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে এসব পণ্য কিনতে পারবেন।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের কারণে স্যামসাং স্মার্টফোন উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ৪জি থেকে ৫জি প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের জন্য নতুন যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে সময় লেগেছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মোবাইল উৎপাদন ইউনিটে বর্তমানে ৫জি পরীক্ষার আধুনিক সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু হবে।

রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বড় পরিসরের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরে সীমিত আকারে উৎপাদন শুরু হলেও আগামী বছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার ইউনিট স্যামসাং রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হিসেন্স ব্র্যান্ডের উৎপাদন অব্যাহত থাকবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে দুটি ব্র্যান্ড মিলিয়ে বছরে প্রায় দেড় লাখ রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স জানিয়েছে, তাদের কারখানার বার্ষিক প্রায় ২৫ লাখ মোবাইল ফোন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে উৎপাদন পুনরারম্ভের প্রথম বছরে ধাপে ধাপে সক্ষমতা ব্যবহার করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে স্মার্টফোন উৎপাদন ইউনিটে। বর্তমানে কারখানায় শুধু সংযোজন নয়, বরং ধাতব বডি তৈরি, যন্ত্রাংশ সংযোজন, ফোম ইনসুলেশন, কম্প্রেসর স্থাপন এবং চূড়ান্ত মান পরীক্ষাসহ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোও স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।

সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের শুরুতে দেশে এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাংলাদেশকে বহুমুখী ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাবে।

সরকারও এ খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে ইলেকট্রনিক্স ও ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্য উৎপাদনের কাঁচামালে শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণের ওপর করও কমানো হয়েছে।

সম্প্রতি কারখানা পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত জিজুন কিম ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সকে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প সহযোগিতার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, বাংলাদেশের দক্ষ মানবসম্পদ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সমন্বয়ে দেশটি ভবিষ্যতে কোরীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

অন্যদিকে, ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক (গ্রে মার্কেট) মোবাইল ফোন আমদানি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অনুকূল নীতিগত পরিবেশ বজায় থাকলে দেশীয় উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সরকারি রাজস্ব—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্যামসাং বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুংমিন জুংও বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, স্থানীয় অংশীদার ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের সঙ্গে যৌথভাবে বৈশ্বিক মান বজায় রেখে বাংলাদেশে উৎপাদন সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি কাজ চালিয়ে যাবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন