অনুসরণ করুন:
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি, সমন্বিত পরিকল্পনার তাগিদ

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতি ভারী বৃষ্টিপাত এবং দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা, নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি এবং নগর এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান সক্ষমতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্ভুল বন্যা পূর্বাভাস, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য বন্যা পূর্বাভাস প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। আগাম সতর্কতা পাওয়া গেলে স্থানীয় প্রশাসন, জরুরি সেবা সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা সহজ হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা পূর্বাভাস আরও কার্যকর করতে আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি, উন্নত রাডার ব্যবস্থা, তাৎক্ষণিক বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির তথ্য সংগ্রহ এবং আবহাওয়া, পানি সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।

তারা মনে করেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করাও সময়ের দাবি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতি ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

নগর এলাকায় জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার দখল, নিচু এলাকা ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হওয়ায় অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই শহরগুলোতে পানি জমে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রিটেনশন পুকুর সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইনওয়াটার হারভেস্টিং) ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বৃষ্টির পানিকে অপচয় না করে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করলে একদিকে জলাবদ্ধতা কমবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতাও হ্রাস পাবে।

তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে নদীবন্যা, নগর বন্যা, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও নিম্নাঞ্চলের বন্যাসহ বিভিন্ন ধরনের বন্যা দেখা যায়। প্রতিটির কারণ ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায় সমাধানও হতে হবে অঞ্চলভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পূর্বাঞ্চলে স্বল্প সময়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে অনেক এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু পাহাড়ি অঞ্চলে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

এ ছাড়া কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেও নগর এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকারিতা হারাচ্ছে। অনেক ড্রেন আবর্জনায় ভরে যাওয়ায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। তাই শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ নয়, বিদ্যমান ড্রেনের নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বন্যা ঝুঁকি কমাতে নগর মহাপরিকল্পনা, ভবন নির্মাণবিধি ও ভূমি ব্যবহার নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, ড্রেনেজ অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আরও সহনশীল করে তুলতে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই ভবিষ্যতের বন্যা ও জলাবদ্ধতার ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন