শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ও উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই হবে না, প্রতিটি শিশু কী শিখছে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার তাগিদ।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেছেন, প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ে এসে কী শিখছে, তার মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি কতটা মজবুত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে শিখনফল, পুষ্টি, শিক্ষক উন্নয়ন, কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা পরিষদে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফিডিং কর্মসূচি’ প্রকল্পের আওতায় প্রধান শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নবিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রাথমিক শিক্ষার ঘাটতি চিহ্নিত করার আহ্বান
ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের কাঙ্ক্ষিত ও যথাযথ শিক্ষা দেওয়া যাচ্ছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এখনো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে শিক্ষকরা চেষ্টা করছেন না কিংবা দায়িত্ব পালনে তাঁদের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, কোথায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সম্মিলিতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। বিদ্যালয়ের সমস্যা, প্রয়োজন ও উন্নয়নসংক্রান্ত প্রস্তাব শিক্ষকদের সরাসরি তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ স্কুল ফিডিং কর্মসূচি
প্রাথমিক পর্যায়েই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাধ্যমিকে যাওয়ার পথে এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। কোনো শিশু যেন বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাদের ধরে রাখা এবং নিয়মিত শিখন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রাখাও এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
খাবারের মান যাচাইয়ে পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পুষ্টিমান বিবেচনায় রেখে খাবারের মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় বিদ্যালয়গুলোতে খাবার সংরক্ষণের জন্য স্টোরেজ সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
খাবারের গুণগত মান নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য তা পরীক্ষাগারে পাঠানোর নির্দেশনা দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যের পরিবর্তে যথাযথ পরীক্ষা ও তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী।
পিইডিপি-৫ বাস্তবায়নে নির্মাণকাজের মান নিশ্চিতের তাগিদ
প্রাথমিক উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদিত হয়েছে জানিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পেতে নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্যায়ে যথাযথ তদারকি ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা অনিয়মের কারণে নতুন অবকাঠামো যেন দ্রুত নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
২০২৭ সালে ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে ফিডিং কর্মসূচিতে আনার পরিকল্পনা
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ভবিষ্যতে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করে ২০২৭ সালে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এত বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ কার্যালয়ের হেড অব প্রোগ্রাম জেসি উড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক এবং বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সভায় বাহুবল উপজেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।
দুই বিদ্যালয়ে ফিডিং কার্যক্রম পরিদর্শন
সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী বাহুবল উপজেলার বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দারাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় বিদ্যালয় দুটিতে চলমান স্কুল ফিডিং কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণ, খাবারের গুণগত মান, সংরক্ষণ ও পরিবেশনব্যবস্থা সম্পর্কেও খোঁজখবর নেন প্রতিমন্ত্রী।

