অনুসরণ করুন:
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে আরও সংঘাতমুখী হতে পারেন ট্রাম্প

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে পররাষ্ট্রনীতিতে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট—এমন আশঙ্কা বিশ্লেষকের।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে। তাঁর প্রশাসনের সদস্যদের অভিশংসন, দুর্নীতির তদন্ত এবং পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে ট্রাম্প বিদেশ নীতিতে আরও সংঘাতমুখী হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়বে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহযোগীরা কংগ্রেসের বিরোধিতা মোকাবিলার কৌশল আগেই ভেবে রেখেছেন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা তাঁদের জন্য একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে বাড়বে রাজনৈতিক চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট নিয়ন্ত্রণ, নির্বাহী বিভাগের ব্যয় নির্ধারণ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে রয়েছে। ফলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে নিবন্ধে বলা হয়েছে, রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা অবস্থাতেও ট্রাম্প কংগ্রেসের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করেছেন। কূটনৈতিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করা হয়েছে। সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার জ্যেষ্ঠ পর্যায়েও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন—এমন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন—এমন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় ৩৫৯টি পদ এখনো শূন্য রয়েছে।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের ক্ষমতা উপেক্ষার অভিযোগ

নিবন্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। পরে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এড়াতে যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেছেন, যদিও বাস্তবে সংঘাত শেষ হয়নি।

লেখাটিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, কংগ্রেস ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অন্য কোনো সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারেন। যুদ্ধের ঝুঁকিতে মার্কিন সেনাদের জীবন বিপন্ন থাকলে প্রেসিডেন্টকে থামানোর রাজনৈতিক চাপ সামলানো কংগ্রেসের জন্য কঠিন হতে পারে।

রাশিয়ার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ

নিবন্ধটির অন্যতম প্রধান বক্তব্য হলো, পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার স্বার্থকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য ও অত্যাধুনিক অস্ত্রপ্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটন উপেক্ষা করেছে বলে এতে দাবি করা হয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের জন্য জো বাইডেন প্রশাসন প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা দিয়েছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সরাসরি সেই সহায়তা বন্ধ করেন। পরে ইউরোপের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনে ইউক্রেনকে দেওয়ার সুযোগ দিলেও সেটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

এ ছাড়া ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও কার্যকর করা হয়নি বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় স্টারলিংক নিয়ে বিতর্ক

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলন মাস্ক ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগের ওপর নির্ভরশীল অস্ত্রব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছেন বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, এসব সংযোগের ওপর নির্ভরশীল প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, দূরপাল্লার হামলা এবং সম্মুখসারির সামরিক অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নিবন্ধকারের মূল্যায়ন।

তাইওয়ান ও কিউবাকে ঘিরে উদ্বেগ

নিবন্ধে আশঙ্কা করা হয়েছে, চীন তাইওয়ানে হামলা চালালে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে বেইজিংয়ের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, দ্বীপরাষ্ট্রটির উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষার জন্য অর্থ দেওয়া।

ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রতিরক্ষার জন্য তাইওয়ানের আমাদের অর্থ দেওয়া উচিত। জানেন তো, আমরা আর কোনো বিমা কোম্পানির চেয়ে আলাদা নই।’

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাইওয়ানের ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি প্যাকেজ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে ট্রাম্প এখনো সেই বিক্রির অনুমোদন দেননি বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কিউবার জনগণকেও ভেনেজুয়েলার মতো মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুত থাকতে হতে পারে বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। এতে কিউবার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং দেশটির অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার আশঙ্কা

নিবন্ধে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা চালানো হবে না বলে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন।

লেখাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের প্রতিরোধের মুখে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল বা উৎখাত করার লক্ষ্যে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

নিবন্ধকারের মতে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ইউক্রেন ও ইউরোপের ওপর। বিশেষ করে ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।

যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো, পোল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলো ও কানাডা রাশিয়ার বিরুদ্ধে বহুমুখী সংঘাতের অভিযোগ তুলেছে। এ সংঘাত সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলেও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে, কানাডা ও ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল করেছেন বলে নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার কিংবা ন্যাটোর সামরিক নেতৃত্ব কাঠামো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়া হলে জোটটি কার্যকারিতা হারাতে পারে।

নিবন্ধকারের আশঙ্কা, আগামী দুই বছর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের জন্য কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়গুলোর একটি হতে পারে। ট্রাম্পের নীতিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের স্বার্থ প্রাধান্য পেলে ইউক্রেনসহ পশ্চিমা মিত্রদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন