অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

তরঙ্গ নবায়নের খরচ কমানোর দাবি মোবাইল অপারেটরদের

উচ্চমূল্যের কারণে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি; মূল্য পরিশোধের শর্ত নমনীয় করার আহ্বান

মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সেবার মানোন্নয়ন ও দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি নবায়নের খরচ কমানো এবং মূল্য পরিশোধের শর্ত আরও নমনীয় করার দাবি জানিয়েছেন মোবাইল অপারেটররা। তাঁদের মতে, মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনায় ব্যবহৃত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি পেতে যে ফি দিতে হয়, তার উচ্চমূল্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে।

আসন্ন তরঙ্গ নবায়ন সামনে রেখে বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর বনানীতে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান সংগঠনটির নেতারা।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে অপারেটরদের আলোচনা ও যোগাযোগের বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তাঁরা বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের আয়ের তুলনায় তরঙ্গের প্রস্তাবিত মূল্য আন্তর্জাতিক ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানদণ্ডের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

উচ্চমূল্যে বাড়ছে বিনিয়োগের চাপ

মোবাইল অপারেটররা জানান, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের মোট আয়ের তুলনায় তরঙ্গ ব্যবহারের ব্যয় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। এমনিতেই আয় স্থবিরতা, গ্রাহকপ্রতি গড় আয় (এআরপিইউ) বৃদ্ধির ধীরগতি এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপে রয়েছে এ খাত। এর সঙ্গে তরঙ্গের উচ্চমূল্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তাঁদের আশঙ্কা, তরঙ্গের দাম বেশি হলে নেটওয়ার্কের আওতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা এবং সেবার মানোন্নয়নে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মোবাইল ডেটার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকায় এ ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি নবায়ন, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মানোন্নয়নে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে তরঙ্গের একক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, সরকারের শুধু তরঙ্গ বরাদ্দ থেকে তাৎক্ষণিক রাজস্ব আয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত নয়। ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে সাশ্রয়ী মূল্যের তরঙ্গের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্সের মূল্য পুনর্বিবেচনার দাবি

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, ২০ বছর মেয়াদি লাইসেন্সের প্রস্তাবিত ফি প্রচলিত নবায়ন মেয়াদের মূল্য আনুপাতিক হারে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ১৫ বছর মেয়াদি তরঙ্গ লাইসেন্সের মূল্য আনুপাতিক হারে বাড়িয়ে ২০ বছর মেয়াদি লাইসেন্সের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত নয়। কারণ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বাজারের চাহিদার ওঠানামা এবং বিনিয়োগের ঝুঁকির কারণে অতিরিক্ত বছরগুলোর অর্থনৈতিক মূল্য ক্রমেই কমে আসে।

এ কারণে তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে আরও যৌক্তিক পদ্ধতি গ্রহণ এবং মূল্য পরিশোধের শর্ত নমনীয় করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, তরঙ্গ নবায়নকে কেবল সরকারের রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে না দেখে দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বিনিয়োগবান্ধব মূল্য কাঠামোর ওপর গুরুত্ব

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলমও অপারেটরদের আয়, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে তরঙ্গের মূল্য কতটা সাশ্রয়ী, তা মূল্যায়নের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব মূল্য নির্ধারণ কাঠামো অপারেটরদের সেবার মানোন্নয়ন, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করবে।

তরঙ্গ লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন মোবাইল অপারেটররা। তাঁদের মতে, এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় আরও নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। তবে লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানোর সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন এর সামগ্রিক আর্থিক শর্তগুলো সহজ ও বাস্তবসম্মত হবে।

তরঙ্গের চাহিদা নির্ধারণে ডেটা ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি বিবেচনার আহ্বান

অপারেটররা আরও বলেন, ভবিষ্যতে তরঙ্গের চাহিদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দ দেওয়া তরঙ্গের পরিমাণ বা মেগাহার্টজ বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে ডেটা ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি, নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ও দক্ষতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

তরঙ্গ নবায়নের মূল্য চূড়ান্ত করার সময় অপারেটরদের আয়ের প্রবণতা, গ্রাহকপ্রতি গড় আয় বৃদ্ধির হার, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।

তাঁদের মতে, তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে আরও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গ্রহণ করা হলে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, নেটওয়ার্কের মানোন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি আরও বেশি মানুষের কাছে ডিজিটাল সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার। এতে বক্তব্য দেন বাংলালিংকের তৈমুর রহমান, গ্রামীণফোনের তানভীর মোহাম্মদ এবং রবি আজিয়াটার শাহেদ আলম।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন