অভিবাসন শুধু রেমিট্যান্স নয়, শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়—হাফিজ উদ্দিন আহমদ
বাংলাদেশকে শুধু জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নয়, বরং অভিবাসনের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবেও গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেছেন, অভিবাসন মানে কেবল বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রবাসী আয় অর্জনের পেছনে শ্রমজীবী মানুষের সীমাহীন কষ্ট, ত্যাগ ও দুর্ভোগের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আজ রাজধানীর ওয়েস্টিন ঢাকা হোটেলে ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘অভিবাসন, অধিকার ও উন্নয়ন বিষয়ক ককাসের উদ্বোধন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আরও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের অনেকেই কর্মস্থলে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও দুর্ভোগের শিকার হন। তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি কার্যকর অভিবাসন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অভিবাসন গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়, অব্যবস্থাপনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্পিকার। তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে বিদেশে কর্মী পাঠাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে। শ্রমিক প্রেরণে অব্যবস্থাপনা ও দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে বিগত বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রবাসী কর্মী পাঠানোর সুযোগ ব্যাহত হয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানে সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সর্বদলীয় সংসদীয় ককাসের মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবেন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে অভিবাসন আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা সরাসরি তদারকি করবেন।
স্পিকারের মতে, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বিদেশগামী কর্মীদের হয়রানি এবং অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তাঁদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিদেশে কর্মরত অনেক শ্রমিক দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়ন ও শোষণের শিকার হচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রবাসী কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান ডেপুটি স্পিকার।
তিনি বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের যেকোনো সংকট ও সমস্যায় দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোর তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচনায় নিরাপদ অভিবাসন, প্রবাসী কর্মীদের মনোসামাজিক ও আর্থসামাজিক সুরক্ষা এবং মানবপাচার প্রতিরোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
আলোচকরা বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলেই হবে না; বরং বিদেশ যাওয়ার আগে থেকে শুরু করে কর্মস্থলে অবস্থান এবং দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত তাঁদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
মানবপাচার বন্ধ এবং অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে সরকারের অভিবাসন নীতির কার্যকর প্রয়োগের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্যানেল আলোচকরা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
সংসদীয় ককাসের সভাপতি এবিএম মোশাররফ হোসেন এবং ককাস সচিবালয়ের সভাপতি সৈয়দ সাইফুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন সংসদীয় ককাসের মহাসচিব ও সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. তৌফিকুর রহমান, উইটনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি শিপা হাফিজা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রাহনুমা সালাম খান, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) শাহরিন মুনির এবং উইনরক ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ দিপ্তা রক্ষিত।
অনুষ্ঠানে ককাসের নির্বাহী কমিটির সদস্য, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, অভিবাসন বিশ্লেষক, গবেষক, আলোচক, আমন্ত্রিত অতিথি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আইনগত সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংসদীয় নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অনিয়ম দূর করা গেলে দেশের অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

