অনুসরণ করুন:
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

সংবিধান দিবসে প্রত্যাশা: আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের কার্যকর নিশ্চয়তা

সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন; জনগণের অধিকার সুরক্ষা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে এর প্রাধান্য বাস্তবে প্রতিষ্ঠা জরুরি।

আজ বাংলাদেশের সংবিধান দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে গণপরিষদে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে সংবিধান কার্যকর হয়।

একটি স্বাধীন দেশের জন্য সংবিধান অনন্য অর্জন। এটি কেবল একটি আইনি দলিল নয়; বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি। এই দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ‘সাংবিধানিক প্রাধান্য’ বা কনস্টিটিউশনাল সুপ্রিমেসি।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত এই সাংবিধানিক প্রাধান্য। এর মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের সব নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

সাংবিধানিক প্রাধান্য কী?

সাংবিধানিক প্রাধান্য বলতে বোঝায়, রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সংবিধানই সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রের তিনটি মূল অঙ্গ—আইনসভা, শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ—সংবিধান থেকেই তাদের ক্ষমতা পায়। তাই তাদের প্রত্যেকের কার্যক্রম সংবিধানের নির্ধারিত সীমার মধ্যে পরিচালিত হতে হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে সাংবিধানিক প্রাধান্যের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’

অন্যদিকে, ৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’

অর্থাৎ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন কার্যকর থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়।

নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় সংবিধান

সংবিধানে নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, চলাফেরা ও সমাবেশের অধিকারসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সাংবিধানিক প্রাধান্য নিশ্চিত করে, রাষ্ট্র বা সরকার ইচ্ছামতো এসব অধিকার খর্ব করতে পারবে না।

রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার প্রয়োগ যাতে স্বেচ্ছাচারী হয়ে না ওঠে, সে জন্যও সাংবিধানিক প্রাধান্য গুরুত্বপূর্ণ। আইনসভা আইন প্রণয়ন করে, শাসনবিভাগ তা বাস্তবায়ন করে এবং বিচারবিভাগ আইনের ব্যাখ্যা দেয়। রাষ্ট্রের এই তিন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারণাটি ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স’ নামে পরিচিত।

এই ভারসাম্য বজায় থাকলে কোনো একটি অঙ্গের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করা সহজ হয়।

সংবিধানের মূল কাঠামো রক্ষার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে অগণতান্ত্রিক পন্থায় সংবিধান পরিবর্তন বা এর মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে বিচারবিভাগ বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক নীতি ও কাঠামো রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে।

তবে সাংবিধানিক প্রাধান্য কেবল সংবিধানের পাতায় লিখিত একটি নীতি হিসেবে থাকলে চলবে না। রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে এর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

সাংবিধানিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় বিচারবিভাগের স্বাধীনতা

সাংবিধানিক প্রাধান্য কার্যকর রাখতে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কোনো আইন বা রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে বিচারিক পর্যালোচনা বা জুডিশিয়াল রিভিউয়ের মাধ্যমে তার বৈধতা পরীক্ষা করা যায়। সংবিধানসম্মত নয় বলে প্রমাণিত হলে আদালত আইন বা পদক্ষেপের সংশ্লিষ্ট অংশ বাতিল করতে পারেন।

এ ক্ষমতার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ সাংবিধানিক প্রাধান্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, আইনের শাসন মেনে চলা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সংবিধান দিবসের তাৎপর্য

সংবিধান দিবস শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকারের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা এবং এর বিধান বাস্তবে কার্যকর করার মধ্য দিয়েই আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন