মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

পারমাণবিক অস্ত্রনীতি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত ইরানের, চলছে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকির মুখে নীতি পরিবর্তনের প্রশ্ন ‘বাস্তব বিষয়’ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য তেহরানের; তবে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখার দীর্ঘদিনের নীতি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকির কারণে এ বিষয়ে নীতি পরিবর্তনের প্রশ্ন এখন বাস্তব হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তা বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।

সোমবার (২ নভেম্বর) বাঘাইয়ের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে চলমান বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। একদিকে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জারি করা ধর্মীয় নির্দেশের ভিত্তিতে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী অবস্থান বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকির যুক্তিতে নীতি পরিবর্তনের দাবি তুলছেন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

খামেনির ধর্মীয় নির্দেশ ও ইরানের দীর্ঘদিনের অবস্থান

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২০০৩ সালে একটি ধর্মীয় নির্দেশ জারি করেন। এতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বহু বছর ধরে ইরানের ঘোষিত পারমাণবিক নীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল এই নির্দেশ।

খামেনি গণবিধ্বংসী অস্ত্রকে ইসলামে নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছিলেন। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে তিনি বলেছিলেন, ‘সবার জন্য পারমাণবিক শক্তি, কারও জন্য পারমাণবিক অস্ত্র নয়।’ অন্য এক বক্তব্যে পারমাণবিক বোমাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলেও অভিহিত করেছিলেন তিনি।

তা সত্ত্বেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরান অবশ্য এসব অভিযোগের বিপরীতে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে।

নীতি পরিবর্তনের প্রশ্নকে বাস্তব বলছেন বাঘাই

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকির কারণে পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক নীতি পরিবর্তনের প্রশ্নটি এখন ‘বাস্তব একটি বিষয়’ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ‘অন্য পক্ষ সেই ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, যিনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ধর্মীয় নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

তবে বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সব সময় শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এখনো শান্তিপূর্ণ রয়েছে’। ইরানকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরার জন্য তিনি ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলকে দায়ী করেন।

তিনি আরও জানান, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য হিসেবে রয়েছে এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এনপিটিতে স্বাক্ষর করে। ইসরায়েল কখনো এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।

পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আহ্বান জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার

ইরানের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের দাবি সম্প্রতি দেশটির অভ্যন্তরেও জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহে তেহরানের অন্তর্বর্তীকালীন জুমার নামাজের ইমাম মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলী আকবারি এক খুতবায় পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক নীতি সংশোধন এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি এ দাবিকে ‘জাতীয় দাবি’ বলে অভিহিত করেন।

কোনো সূত্র উল্লেখ না করে তিনি দাবি করেন, জনমত জরিপে ইরানের ৭০ শতাংশ মানুষ নীতি পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব তৈরির আহ্বান জানান আকবারি। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কাছে জমা দেওয়া যেতে পারে। বাবার হত্যাকাণ্ডের পর মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

‘পরিস্থিতি বদলে গেছে’ বলছেন আইনপ্রণেতা

ইরানের আইনপ্রণেতা আহমদ নাদেরি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো ও বোমা তৈরির পক্ষে কথা বলে আসছেন। তাঁর ধারণা, মোজতবা খামেনির অবস্থান তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অবস্থান থেকে ভিন্ন হতে পারে।

নাদেরি বলেন, নীতি পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ‘শহীদ নেতা ভুল ছিলেন’। বরং তাঁর ভাষায়, ‘পরিস্থিতি বদলে গেছে। তখন আমাদের ওপর হামলা হয়নি, এখন হয়েছে।’

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা চালায় এবং দেশটির নেতৃত্বের বড় একটি অংশকে হত্যা করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পর থেকেই ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক নীতি নিয়ে বিতর্ক চলছে।

আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, আলোচনা চলছে

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি পারমাণবিক অস্ত্রনীতি নিয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

রেজায়ি প্রশ্ন তোলেন, ‘আবার যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কি আগের সেই পুরোনো নীতিতেই থাকতে চাই?’

আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের সঙ্গে সহযোগিতা করার পরও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কেন বোমা হামলা চালানো হয়েছে, তা নিয়েও দেশটির মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের চিঠির জবাব দেয়নি তেহরান

রেজায়ি জানান, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে এবং ওয়াশিংটন আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে ইরান তার সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেন রেজায়ি। তবে এখনো চিঠিটির জবাব দেননি তিনি।

রেজায়ির ভাষ্য, চিঠিটির ভাষা ও সুরে ‘সম্পূর্ণ পরিবর্তন’ এসেছে, যা তাঁর কাছে ‘খুবই ভালো একটি লক্ষণ’ বলে মনে হয়েছে।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে ইরানের শর্তগুলো পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের বৈধ দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে না। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া কিংবা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও তিনি অনিশ্চয়তার কথা জানান।

বাঘাইয়ের মতে, আলোচনার টেবিলে একমাত্র প্রস্তাব হলো তেহরানের দেওয়া সাত দফা পরিকল্পনা, যা দুই দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্রের দাবি নিয়ে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা

ইরানের সব বিশ্লেষক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে নন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাদের বাস্তানি সতর্ক করে বলেছেন, হঠাৎ করে পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবিতে যে সম্মিলিত আওয়াজ উঠেছে, তা ‘আবেগনির্ভর অবস্থান’। তাঁর মতে, এটি শত্রুপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং ইরানকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করছে।

বাস্তানি বলেন, এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের যৌক্তিকতা তৈরিতেও সহায়তা করতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘অন্যদের মনে ইরানকে নিয়ে ভয় তৈরি করে দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত নয়।’

এর পরিবর্তে এনপিটির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা, যাচাইযোগ্য নিশ্চয়তা দেওয়া এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি পারমাণবিক জোট গঠনের প্রস্তাব সামনে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।

প্রতিরোধমূলক যুক্তি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি

আরেক ইরানি বিশ্লেষক কিয়োমার্স আশতারিয়ান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের প্রতিরোধমূলক যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হলে তা ‘পারমাণবিক হামলা প্রতিরোধে কাজে আসবে, প্রচলিত যুদ্ধ প্রতিরোধে নয়’।

অর্থাৎ, তাঁর ব্যাখ্যায় এ ধরনের অস্ত্রের লক্ষ্য হবে ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা ঠেকানো, সাধারণ যুদ্ধ প্রতিরোধ করা নয়।

তবে আশতারিয়ান সতর্ক করে বলেন, এমন পদক্ষেপের ফলে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার মুখেও পড়তে পারে দেশটি।

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে—এমন আশঙ্কাও এখন পুরোপুরি অবাস্তব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইরানে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা নিয়ে নতুন আলোচনা

মার্কিন সম্প্রচারক টাকার কার্লসনের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের পর ইরানে সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কার্লসন দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘চাপের মুখে’ ট্রাম্প প্রশাসন ‘কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে’।

তিনি হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পারমাণবিক স্থাপনার নাম উল্লেখ করেন। তবে কার্লসনের এ দাবির পক্ষে প্রতিবেদনে কোনো স্বাধীন প্রমাণের উল্লেখ নেই।

ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে চলমান বিতর্কে নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নীতি পরিবর্তনের দাবি জোরালো হলেও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ইরানের ঘোষিত অবস্থানে কী পরিবর্তন হবে, তা স্পষ্ট নয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন