বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

শ্রমিক অসন্তোষে টানা তৃতীয় দিনেও ৬৯০ পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

১৭ লাখের বেশি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত; শিপমেন্ট, বেতন-ভাতা ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগে মালিকেরা, সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা।

ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের কাজে না ফেরা, মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন এবং হামলা-ভাঙচুরের আশঙ্কায় গত সোমবার (২ নভেম্বর) টানা তৃতীয় দিনের মতো দেশের অন্তত ৬৯০টি তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানায় ১৭ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন।

দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো বা শিপমেন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কারখানার মালিকেরা। একই সঙ্গে আগামী মাসগুলোতে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং ব্যাংকঋণ সামলানো নিয়েও সংকটের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

পোশাকের নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে সহিংসতা শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিদেশি ক্রেতারা। অন্যদিকে, শ্রমিক অসন্তোষ ও সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের আশপাশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে যান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে।

৬৯০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, সবচেয়ে বেশি গাজীপুরে

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট মিজানুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৬৭০টি কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের আরও অন্তত ২০টি বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক।

বিজিএমইএর অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে শ্রম অসন্তোষের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। হামলা-ভাঙচুরের আশঙ্কা এবং শ্রমিকদের কাজে না আসার কারণে এ অঞ্চলের মোট ৩৮২টি কারখানা সোমবার পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এসব কারখানায় প্রায় ৯ লাখ শ্রমিক কাজ করেন।

এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকায় ২২৩টি এবং ঢাকার মিরপুরে ৬৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। নারায়ণগঞ্জের প্রায় ২০টি কারখানাও বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকেরা।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, নারায়ণগঞ্জের তুলনামূলক বড় কারখানাগুলোর উৎপাদনও বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকেরা।

শিপমেন্ট ও আর্থিক দায় মেটানো নিয়ে উদ্বেগ

টানা উৎপাদন বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পোশাক সরবরাহ করা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

একই সঙ্গে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার আর্থিক দায় অব্যাহত থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন মালিকেরা।

পোশাকের নতুন ক্রয়াদেশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ায় বিদেশি ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

কারখানা খোলা রাখার আহ্বান সরকারের, নিরাপত্তা চান মালিকেরা

তৈরি পোশাক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা শ্রমিক প্রতিনিধি, কারখানার মালিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন।

এসব বৈঠকে সরকার মালিকদের কারখানা খোলা রাখার আহ্বান জানায়। জবাবে মালিকেরা কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।

যেসব কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তাঁদের কারখানা খোলা রাখতে বলা হয়েছে। মঙ্গলবারের পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপরও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিলে অথবা কারখানায় আবার হামলা হলে সভা করে সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরা।

সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্রম আইনের ১৩/১ ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ সরকারের

তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাকশিল্পে সহিংসতার ঘটনায় কিছু কারখানার মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সক্রিয় সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

পোশাক খাতের দুই শীর্ষ সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, কিছু কারখানার মালিক অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে বলে যেসব মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের একটি তালিকা সরকারের কাছে জমা দিতে অন্য মালিকেরা রাজি হয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি পূরণ হওয়ার পরও আন্দোলনের নামে সড়ক-মহাসড়কে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে বলে সরকার মনে করছে। সীমান্তের ওপারের শক্তির ইন্ধনে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী।

আন্দোলনে মুখোশধারী উসকানিদাতারা অনুপ্রবেশ করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

শ্রমিক নেতাদের আহ্বান: উসকানিতে পা না দিয়ে কাজে ফিরুন

মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি ও অধিকারকর্মীরা দ্রুত বোর্ডের বৈঠক আহ্বান, নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের উসকানিতে কান না দিয়ে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মজুরি বোর্ডের সদস্য ও শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এর আগে সংবাদ সম্মেলনেও তিনি বলেন, প্রয়োজনে শ্রমিকদের আবার আন্দোলনে ডাকা হবে। তবে তার আগে দ্রুত মজুরি বোর্ডের বৈঠক করে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণা করার লক্ষ্যে কাজ করা হবে।

তিনি জানান, প্রয়োজন হলে দিন-রাত বৈঠক করে মজুরি কাঠামো ঘোষণার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার এবং শ্রমিক অধিকারকর্মী নাজমা আক্তারও নিজেদের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় শ্রমিকদের শান্ত থাকার এবং উৎপাদনকাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে শ্রমিক নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কোনো নিরীহ শ্রমিক যেন পুলিশি হয়রানি বা গ্রেপ্তারের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

মিরপুরের সহিংসতায় পাঁচ মামলা, গ্রেপ্তার ৬০

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের ওপর হামলা, ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পৃথক পাঁচটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় গত দুই দিনে অন্তত ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী ও সক্রিয় সদস্যের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, এ ঘটনায় আরও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরে নতুন করে হামলা-ভাঙচুর

সোমবারও ঢাকার মিরপুরে চলমান আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে দুটি বড় তৈরি পোশাক কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-২-এর বড়বাগ এলাকায় সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড ও দেশন অ্যাপারেলসে হামলা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সময়ে সাভার ও গাজীপুরে একাধিক যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গাজীপুরের দুটি প্রধান মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। মিরপুর ও আশুলিয়ার সড়কেও নতুন করে বিক্ষোভ হয়।

শ্রমিকদের মজুরি দাবি, কারখানার নিরাপত্তা, উৎপাদন সচল রাখা এবং সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের বিষয়গুলো এখন তৈরি পোশাক খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন