সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

সুন্দরবন ও উপকূলে জলদস্যুতা কমেছে, জোরদার হয়েছে নিরাপত্তা

যৌথ অভিযান ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে ৩৯ বনদস্যু আটক, ৪১ জিম্মি উদ্ধার; চলতি বছর ছয় জলদস্যু বাহিনীর ৫১ সদস্যের আত্মসমর্পণ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান, নিয়মিত টহল এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন জলসীমায় জলদস্যুতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জেলে, মৌয়াল ও অন্যান্য বনজীবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ অভিযান, আধুনিক সামুদ্রিক নজরদারি এবং জীবিকায়ন সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব উদ্যোগের ফলে উপকূলের বন ও জলজ সম্পদনির্ভর মানুষের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির সুযোগ বাড়ছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বিচ্ছিন্নভাবে জলদস্যুতার ঘটনা এখনো ঘটছে।

সুন্দরবনে যৌথ অভিযানে গুরুত্ব

গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জেলেদের সুরক্ষায় পুলিশ, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড (বিসিজি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বন বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে।

‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে বিশেষ অভিযানের আওতায় জলদস্যুদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান ও নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।

কোস্টগার্ডের অভিযানে ৩৯ বনদস্যু আটক, ৪১ জিম্মি উদ্ধার

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, জলদস্যুপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনী, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বিজিবি, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে কোস্টগার্ড।

তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, ওয়াকিটকি, দূরবীক্ষণ যন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৪১ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

সাব্বির আলম সুজন আরও জানান, চলতি বছর ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৫১ সদস্য কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

শুঁটকি মৌসুমে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা

গত ৩০ অক্টোবর শুরু হওয়া পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চর, আলোরকোল ও কটকাসহ আশপাশের জলপথে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা।

জলদস্যুদের হুমকির মুখে পড়লে জেলে ও ব্যবসায়ীদের কোস্টগার্ডের জরুরি হটলাইন ১৬১১১-এ যোগাযোগের আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে, এসআরবি-৬-এর কমান্ডার নিস্তার আহমেদ বলেন, ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৭৪ সদস্য এলিট ফোর্সটির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

বনজীবী ও জেলেদের নিরাপত্তায় সতর্কতা

খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জেলেদের গভীর সমুদ্র কিংবা বনের দুর্গম এলাকায় একা না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকার দলবদ্ধ বহর নিয়ে চলাচলে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বন বিভাগের সদস্য মোতায়েন থাকবে।

উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে আধুনিক টহল জাহাজ, স্পিডবোট, রাডার, জিপিএস ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

অপহৃত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং মুক্তিপণের লেনদেনের সূত্র অনুসন্ধানেও ড্রোন প্রযুক্তি ও আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ সহায়তা করছে।

বিচ্ছিন্নভাবে জলদস্যুতার ঘটনা এখনো ঘটছে

নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির পরও সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় জলদস্যুতার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। গত ১২ অক্টোবর সুন্দরবনের শিবসা নদীর আরবনিয়া খাল এলাকায় সম্রাট বাহিনীর অপহৃত চার জেলেকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড।

শরণখোলা উপজেলার বনজীবী রমজান আলী বাসসকে বলেন, আগে জলদস্যুদের আতঙ্ক নিয়ে তাঁদের বনে যেতে হতো। গত মৌসুমে তাঁর দলের কয়েকজন সদস্য জিম্মি হওয়ার পর প্রত্যেকের জন্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হয়েছে।

তাঁর এ বক্তব্যে জলদস্যুতার কারণে বনজীবীদের আর্থিক ক্ষতি ও নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের খাদ্যসহায়তা

নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তিন মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞাকালে নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের জেলে শাহাবুদ্দিন ব্যাপারী বাসসকে বলেন, সরকারি এ সহায়তা তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমিয়েছে।

দক্ষিণ বেদকাশীর জেলে জব্বার মোল্লা জানান, গত ৩০ অক্টোবর ৪০টি মাছ ধরার নৌকার একটি বহর দুবলার চরে পৌঁছেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জোরদার নিরাপত্তাব্যবস্থা তাঁদের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তায় আরও সমন্বয়ের তাগিদ

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিমরাড) মহাপরিচালক কমডোর (অব.) সৈয়দ মেসবাহ উদ্দিন আহমদ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও উপকূলীয় সম্পদ সুরক্ষায় নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, জলদস্যুতা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি নয়; এটি উপকূলীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, পর্যটন ও বন সংরক্ষণের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

টেকসই উপকূলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোপন তথ্যদাতাদের সুরক্ষা, সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি বলেও মন্তব্য করেন এই সাবেক নৌ-কর্মকর্তা ও গবেষক।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন