সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: ইতিহাসের কোন মোড়ে দাঁড়িয়ে ২০২৬?

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার আশা ডেমোক্র্যাটদের; ১৮৭৪ ও ১৮৯৪ সালের ঐতিহাসিক বিপর্যয় থেকে আধুনিক রাজনীতির শিক্ষা কী?

চলতি বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। তবে সম্ভাব্য জয়ের ব্যবধান কতটা বড় হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মার্কিন রাজনীতিতে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নয়, কতটি আসনের ব্যবধানে জয় আসছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কংগ্রেসে আসনসংখ্যার ব্যবধান আইন প্রণয়ন, প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কয়েকটি মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে, যেগুলো ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছিল এবং জাতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। বিশেষ করে ১৮৭৪ ও ১৮৯৪ সালের নির্বাচন দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ও জনঅসন্তোষ কীভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারে। সেই ইতিহাসের আলোকে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা।

রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া দুই ঐতিহাসিক নির্বাচন

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ‘রি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস বলতে এমন পরিবর্তনকে বোঝানো হয়, যার ফলে দলীয় সমর্থনের ধরন ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় রদবদল ঘটে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ১৮৭৪ ও ১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এ ধরনের পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

১৮৭৪ সালের নির্বাচনে অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির অভিযোগে চাপে থাকা রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে বড় ধরনের আসন হারায়। অন্যদিকে, ১৮৯৪ সালের নির্বাচনে অর্থনৈতিক মন্দা ও শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপক পরাজয় ঘটে। দুটি নির্বাচনই দেখিয়েছিল, প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে জাতীয় নীতিনির্ধারণে তার প্রভাব কতটা কমে যেতে পারে।

১৮৭৪: পুনর্গঠন যুগের অবসানের পটভূমি

যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের পর দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা ‘রিকনস্ট্রাকশন’ নামে পরিচিত। এ সময় সদ্য মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্র্যান্টের প্রশাসন ১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক সংকট এবং বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে চাপে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে ১৮৭৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৯০টিরও বেশি আসন বাড়িয়ে নেয় বলে প্রদত্ত বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটে।

নির্বাচনের ফল দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীগুলো সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দিতে থাকে। বিভিন্ন রাজ্যে বৈষম্যমূলক আইন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিস্তার ঘটে।

১৮৭৬ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর রাদারফোর্ড বি হেইজের ক্ষমতায় আসাকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়, তার পরিণতিতে দক্ষিণাঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণাঞ্চলে বর্ণবৈষম্যমূলক ‘জিম ক্রো’ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে, যা দীর্ঘদিন ধরে কৃষ্ণাঙ্গদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সীমিত করে রেখেছিল।

এ কারণে ১৮৭৪ সালের নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক পুনর্গঠন যুগের অবসানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড় হিসেবে দেখেন। ১৮৭৬ সালের সমঝোতা ছিল সেই পরিবর্তনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৮৯৪: ডেমোক্র্যাটদের বিপর্যয়, রিপাবলিকানদের উত্থান

১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় আসনবদলের ঘটনা। তৎকালীন ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের দ্বিতীয় মেয়াদে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। ১৮৯৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দা, রেলশ্রমিকদের ধর্মঘট এবং বেকার মানুষের বিক্ষোভ সরকারের ওপর চাপ বাড়ায়।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ভোটাররা ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। প্রতিনিধি পরিষদে দলটি বিপুলসংখ্যক আসন হারায় এবং রিপাবলিকানরা বড় ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ছিল ২১৮, আর রিপাবলিকানদের ১২৪। নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটদের আসন কমে ১০৪-এ নেমে আসে, বিপরীতে রিপাবলিকানদের আসন বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৪।

এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে রিপাবলিকানদের প্রভাব বাড়ানোর পথ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে উইলিয়াম ম্যাককিনলির ১৮৯৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। পরবর্তী দশকগুলোতে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার পরিবর্তন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্সির বিকাশ ঘটে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্টের জন্য সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে আসন হারালে তা তাঁর নীতি ও জনপ্রিয়তার বিষয়ে ভোটারদের অসন্তোষের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৪৬, ১৯৫৮, ১৯৬৬, ১৯৭৪, ১৯৯৪, ২০১০ ও ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে পরিচিত। এসব নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে ক্ষমতাসীন দলের আসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

তবে নির্বাচনী পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্টদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একই রকম হয়নি। হ্যারি ট্রুম্যান ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ের পর রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসকে ‘ডু-নাথিং কংগ্রেস’ বলে আক্রমণ করেন। ১৯৪৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন।

বিল ক্লিনটন ১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় পরাজয়ের পর রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনেন এবং ১৯৯৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। বারাক ওবামাও ২০১০ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হন।

অন্যদিকে, জেরাল্ড ফোর্ড ও ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হন। লিন্ডন বি জনসনও ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ১৯৬৮ সালের নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেন। এসব উদাহরণ দেখায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রেসিডেন্টের জন্য সতর্কবার্তা হলেও তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি নির্ভর করে আরও অনেক বিষয়ের ওপর।

২০২৬ সালের নির্বাচনে কী বলছে সমীকরণ

২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই ভোট হওয়ার কথা। প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, বর্তমানে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১২টি আসন রয়েছে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য খুবই কাছাকাছি।

এই ব্যবধানের কারণে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে বড় ধরনের নির্বাচনী ঢেউয়ের প্রয়োজন নাও হতে পারে। মাত্র কয়েকটি আসন হাতবদল হলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ বদলে যেতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দলটির নেতা হাকিম জেফরিস প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

তবে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে জনমত জরিপের পাশাপাশি প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, স্থানীয় ইস্যু, ভোটার উপস্থিতি, নির্বাচনী এলাকার সীমানা এবং প্রচারণার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দলীয় স্বার্থে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, যা ‘জেরিম্যান্ডারিং’ নামে পরিচিত, সেটিও আসনসংখ্যার সমীকরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

ট্রাম্পের জনসমর্থন, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষকে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য সুবিধার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে জরিপ বা বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। নির্বাচনের প্রকৃত ফল নির্ভর করবে ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর।

ইতিহাসের শিক্ষা: আসনসংখ্যার ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ

মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোনো দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেল কি না, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো কতটি আসনের ব্যবধানে সেই নিয়ন্ত্রণ অর্জিত হলো। অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলকে আইন পাস, বাজেট অনুমোদন এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। বিপরীতে বড় ব্যবধানে জয় পেলে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ বাড়তে পারে।

১৮৭৪ ও ১৮৯৪ সালের নির্বাচন দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অসন্তোষ কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারে। আধুনিক যুগের নির্বাচনগুলোও প্রমাণ করেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় প্রেসিডেন্টকে নীতি ও রাজনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।

২০২৬ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে এর ফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা করবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোটারদের রায়ই নির্ধারণ করবে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার ভারসাম্যে সাময়িক পরিবর্তন আনবে, নাকি জাতীয় রাজনীতির গতিপথে আরও গভীর প্রভাব ফেলবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন