স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ; থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে পরীক্ষা করার পরামর্শ
রক্তের অভাবে যেন কোনো মানুষের মৃত্যু না হয়, সে জন্য পর্যাপ্ত রক্তের মজুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে মরণোত্তর চক্ষুদান কার্যক্রম জোরদার এবং কর্নিয়া সংগ্রহে বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
আজ জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সচেতনতা বাড়াতে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু সেমিনার আয়োজন করে রক্তদান কর্মসূচির গতি বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে রক্তদানের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, মানুষকে বোঝাতে হবে যে রক্তদান করলে দাতার শারীরিক ক্ষতি হয় না। বরং এক ব্যাগ রক্ত একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও রক্তদানকে মহৎ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, একজন মানুষের জীবন বাঁচানো অনেক বড় দান। রক্তদানের মাধ্যমে অন্যের জীবন রক্ষা করা পরকালের জন্যও সওয়াবের কাজ। তাই এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন।
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে পরীক্ষা জরুরি
থ্যালাসেমিয়া প্রসঙ্গে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাঁদের সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়, যা রোগী ও পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ কারণে বিয়ের আগে বর-কনের থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, তা পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রোগটির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রক্তের চাহিদা ও সংকট কমাতেও তা ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
রক্তের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা ও কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বানও জানান তিনি।
সন্ধানীর কার্যক্রমে সহযোগিতার আশ্বাস
সন্ধানীর কার্যক্রম এগিয়ে নিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, রক্ত সংগ্রহের জন্য যেসব প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, মন্ত্রণালয় সাধ্যমতো সহযোগিতা করবে। দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত সন্ধানীর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
কর্নিয়া সংগ্রহে সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, সন্ধানী মূলত মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের সংগঠন। রক্ত ও কর্নিয়া সংগ্রহের জাতীয় কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছে।
তিনি বলেন, রক্ত সংগ্রহের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও কর্নিয়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। দেশের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় কর্নিয়া সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
ভবিষ্যতে রক্ত কিংবা কর্নিয়ার জন্য যেন অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভর করতে না হয়, সে লক্ষ্যে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
মরণোত্তর চক্ষুদানে ভুল ধারণা দূর করার আহ্বান
বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ২ নভেম্বরকে জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস হিসেবে ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
তিনি বলেন, রক্তদানের বিষয়ে মানুষের সচেতনতা ও আগ্রহ বাড়লেও মরণোত্তর চক্ষুদানের ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত সচেতনতা তৈরি হয়নি।
ধর্মীয় ও সামাজিক নানা ভুল ধারণা এবং কুসংস্কারের কারণে অনেকে মরণোত্তর চক্ষুদানে আগ্রহী হন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে গ্রামগঞ্জের মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক সিদ্দিকী। এ ক্ষেত্রে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
র্যালিতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এন এম মঈনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম শাকিল এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন।
এ ছাড়া সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. ফজলুল হক কাশেম এবং মহাসচিব ও উদযাপন উপকমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
দিবসটি উপলক্ষে সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের নিচতলার চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার বহন করেন।

