অনুসরণ করুন:
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

এলডিসি উত্তরণ টেকসই করতে কাঠামোগত সংস্কারে জোর দিচ্ছে সরকার: অর্থ উপদেষ্টা 

অতিরিক্ত তিন বছরকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা; ব্যাংকিং, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজারে সংস্কারের অগ্রাধিকার।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংককে সম্পৃক্ত করে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছরকে শুধু সময় বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে না দেখে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরিতে কাজে লাগাতে চায় সরকার।

রোববার সচিবালয়ে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ‘গ্র্যাজুয়েশন থেকে ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি’তে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।

প্রস্তুতির বাড়তি সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ

উপদেষ্টা বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্বের মেয়াদ বাড়ানোকে সরকার একটি সামগ্রিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে—উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনীতির দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সৃষ্ট বাহ্যিক ধাক্কা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগে থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সংস্কারের কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিতুমীর। তিনি বলেন, সরকার প্রথম থেকেই এলডিসি উত্তরণের পক্ষে। তবে উত্তরণ যেন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে হয়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

সংস্কারের প্রথম অগ্রাধিকার ব্যাংকিং খাত

তিতুমীর বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রথম অগ্রাধিকার। এর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, নতুন বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং নতুন পণ্যের বাজার তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এলডিসি উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

উপদেষ্টার মতে, বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। উত্তরণসংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন বলেও জানান তিনি। এসব উদ্যোগ সরকারের ‘থ্রি আর’ কৌশলের অংশ।

পাঁচ পক্ষের অংশীদারত্বে সংস্কার উদ্যোগ

এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে পাঁচ পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার কথা তুলে ধরেন তিতুমীর। পক্ষগুলো হলো—বাংলাদেশের জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক।

তিনি বলেন, এমন সর্বসম্মত অংশীদারত্ব আগে কখনো হয়নি। সরকারের চিহ্নিত অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কারে সহায়তার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)।

আইএমএফের কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে দাবি করে তিতুমীর বলেন, আগে কোনো সংস্কারে দেশের মানুষকে এভাবে যুক্ত করা হয়নি। পাঁচ পক্ষের অংশগ্রহণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতেও সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা

টেকসই শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। এ লক্ষ্যে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিতুমীরের মতে, মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন বাজার ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য

এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুবিধা কমে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে এফটিএ বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

পাশাপাশি নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, এসব সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন ও রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন