শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

নয় মাসে ইসলামী ও ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান ৬ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা

খেলাপি বিনিয়োগ, আয় কমে যাওয়া ও আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধিতে চাপে দুই ব্যাংক; ন্যাশনাল ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান প্রায় ১১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা

২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাতের দুই ব্যাংক—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল ব্যাংক। বিপুল খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক দুটি সম্মিলিতভাবে ৬ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে।

প্রকাশিত আর্থিক ফলাফল অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ ৩ হাজার ১৬.৮৯ কোটি টাকা।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য গত বৃহস্পতিবার উভয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, গতকাল সংবাদপত্রে নয় মাসের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

ইসলামী ব্যাংকের বড় ছন্দপতন

২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সমন্বিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটি ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার সমন্বিত লোকসানে পড়েছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাদ দিয়ে এককভাবে হিসাব করলে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩০২.৫৭ কোটি টাকা।

প্রান্তিক আর্থিক ফলাফল অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংকটি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। শুধু এই তিন মাসেই লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭০.১৮ কোটি টাকা।

আর্থিক ফলাফলে এমন পরিবর্তনের কারণ হিসেবে ব্যাংকটি বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

ব্যাংকটির ভাষ্য, অতীতে বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর তহবিল আত্মসাতের কারণে খেলাপি বিনিয়োগের পরিমাণ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এসব বিনিয়োগ থেকে আয় হিসেবে অর্থ অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ আয়ে।

ব্যাংকটি আরও জানিয়েছে, মেয়াদ শেষে মোট আমানতের পরিমাণ কমলেও আমানতের বিপরীতে প্রদত্ত মুনাফার ব্যয় বেড়েছে।

আমানত তুলে নেওয়ায় নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক

২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত নয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের নিট পরিচালন নগদ প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ আগের ইতিবাচক অবস্থান থেকে নেমে ঋণাত্মক ৩৬.৫৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংকটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আমানত তুলে নেওয়ার কারণে নগদ প্রবাহ কমে গেছে।

আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা, সম্পদের গুণগত মান উন্নত করা, বিনিয়োগ আদায়ের গতি বাড়ানো এবং আয় বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

পাশাপাশি আমানত সংগ্রহ জোরদার করা, পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখা এবং পরিচালন নগদ প্রবাহের উন্নয়নেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংক ১৩৬ কোটি টাকা মুনাফা করলেও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি।

ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান প্রায় দ্বিগুণ

২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ১৬.৮৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় লোকসান প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ১ হাজার ৪৪৮.৪২ কোটি টাকা। সে সময় শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৪.৫০ টাকা।

চলতি বছরের জুন শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৮৩.৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকটি নতুন করে আরও ৭৩৩.০৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে।

লোকসানের কারণ হিসেবে ব্যাংকটি জানিয়েছে, কিছু ঋণ ও অগ্রিম খেলাপি হয়ে পড়ায় এবং সেগুলো আদায় না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সুদ আয় হিসেবে দেখানো যায়নি। পাশাপাশি আমানত ও ধারের বিপরীতে সুদ বাবদ ব্যয়ও বেড়েছে।

ব্যাংকটির মতে, এসব কারণে আলোচ্য সময়ে পরিচালন লোকসান হয়েছে এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও নিট সম্পদমূল্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। তবে গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসায় আগের বছরের তুলনায় আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমেছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

চার বছর নয় মাসে পুঞ্জীভূত লোকসান ১১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা

আগের আর্থিক প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকেই বড় অঙ্কের লোকসান দিয়ে আসছে ন্যাশনাল ব্যাংক।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার বছর নয় মাসে ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯১৪.১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ৮৯৭.২৮ কোটি টাকা। আর ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে লোকসান হয়েছে আরও ৩ হাজার ১৬.৮৯ কোটি টাকা।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) আগের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রাহকেরা টাকা জমা দেওয়া ও তোলার পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলা শুরু করায় অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরেছে।

বর্তমানে গ্রাহকেরা ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন। একই সঙ্গে কিছু শাখায় ব্যবসায়িক হিসাবে নতুন আমানত জমা নেওয়াও শুরু হয়েছে।

৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা

স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে ন্যাশনাল ব্যাংক ৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছে বলে টিবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এই অর্থ দিয়েছে। তবে তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু শর্ত আরোপ করেছে।

শর্ত অনুযায়ী, এই অর্থ দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক বা বর্তমান পরিচালকদের আমানত ফেরত দেওয়া যাবে না। একইভাবে নতুন ঋণ বিতরণের কাজেও এ তহবিল ব্যবহার করা যাবে না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন