অনুসরণ করুন:
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে আদায় মাত্র ৪ কোটি টাকা, প্রকৃত মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ২৬ কোটি

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই আটকে আছে মাত্র ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে। ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অথচ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তাঁদের কাছ থেকে ব্যাংকটি আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ডিপার্টমেন্টের তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা।

বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, ঋণ অবলোপন এবং আদালতে চলমান মামলার দীর্ঘসূত্রতা আর্থিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। পাশাপাশি মূলধন ঘাটতি ও লোকসান ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।

শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে আদায় তলানিতে

রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের চিত্র কয়েক বছর ধরেই ওঠানামা করছে। ২০২৪ সালে এই ২০ ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ব্যাংকটি আদায় করেছিল ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে আদায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬১ কোটি টাকা। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায় নেমে এসেছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকায়।

সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮১ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা আদায় করেছিল ব্যাংকটি। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। অথচ চলতি বছরে খেলাপি ঋণ থেকে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে রূপালী ব্যাংক।

খেলাপির তালিকায় শীর্ষে বেক্সিমকো

রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় ৯৯৪ কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণ নিয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। ৯০৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের ক্রোনী গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির পাওনা ৮৭২ কোটি টাকা। খুলনার জুট টেক্সটাইল মিলসের কাছে ৭২৪ কোটি, চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপের কাছে ৬৩০ কোটি এবং চট্টগ্রামের এইচ এস কম্পোজিটের কাছে ৬২০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

অন্য ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মাদারীপুর স্পিনিং মিলসের কাছে ৬১৮ কোটি টাকা, ব্লু প্লানেট গ্রুপের বদর স্পিনিং মিলসের কাছে ৬০৪ কোটি, ডলি কনস্ট্রাকশনের কাছে ৫০৬ কোটি এবং সাত্তার গ্রুপের কাছে ৪০৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ব্যাংকটির।

শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় আরও রয়েছে বেনিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, যার কাছে পাওনা ৩৭১ কোটি টাকা; খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল, ৩২৫ কোটি টাকা; এস আলম গ্রুপের গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন ও সোনালী ট্রেডার্স, ৩১৬ কোটি টাকা; বসুন্ধরা গ্রুপের বসুন্ধরা মাল্টি পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ ও বসুন্ধরা পেপার মিল লিমিটেড, ৩০৯ কোটি টাকা; এবং থার্মেক্স গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান, ৩০২ কোটি টাকা।

এ ছাড়া গ্যালকো স্টীল (বাংলাদেশ) লিমিটেডের কাছে ২৮৭ কোটি টাকা, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল লিমিটেডের কাছে ২৮৫ কোটি, বেঙ্গল লেদারের কাছে ২৭৫ কোটি, জাপান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ পেপার লিমিটেডের কাছে ২৭০ কোটি এবং ভার্গো মিডিয়ার কাছে ২৪০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

তবে রূপালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে, বসুন্ধরা পেপার মিল লিমিটেড ও ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল লিমিটেড এপ্রিল মাসে এবং বেনিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও জুট টেক্সটাইল মিলস মে মাসে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে।

অবলোপন করা ঋণ থেকেও আদায় কম

খেলাপি ঋণ আদায় দুর্বল থাকলেও ঋণ অবলোপনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রূপালী ব্যাংক ৪৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। এর আগে ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছিল।

অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স শিট বা মূল হিসাব থেকে সরিয়ে রাখা হয়। তবে এতে ঋণগ্রহীতার কাছে পাওনা অর্থ আদায়ের দায় শেষ হয়ে যায় না।

রূপালী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অবলোপন করা ঋণ থেকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে এ খাত থেকে ৪৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে ২৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা আদায় হয়েছিল।

অর্থঋণ আদালতে ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা আটকে

খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলার দীর্ঘসূত্রতাও ব্যাংকটির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে রূপালী ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।

মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগায় ঋণ আদায় বিলম্বিত হচ্ছে। এতে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে।

মূলধন ঘাটতি ও লোকসানে বাড়ছে সংকট

উচ্চ খেলাপি ঋণের পাশাপাশি তীব্র মূলধন সংকটে রয়েছে রূপালী ব্যাংক। গত জুনে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেওয়া রেগুলেটরি ফারবিয়ারেন্সের পর মূলধন ঘাটতি কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকায়।

একই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ২৩৩ কোটি টাকা এবং নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৯৭ কোটি টাকা।

জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ব্যাংকটির ঋণ-আমানত অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের তারল্যে চাপ তৈরি করছে

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোতে গুরুতর আর্থিক সংকট তৈরি হচ্ছে। এর অন্যতম প্রভাব পড়ছে তারল্যের ওপর। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে আমানতের অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলোর নতুন করে লাভজনক খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মূলধন সংকট তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতি ঋণ আদায় ও পুনর্বিনিয়োগের স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। পাশাপাশি ব্যাংকের মুনাফা অর্জন, মূলধন পর্যাপ্ততা, নতুন ঋণ বিতরণ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত রূপালী ব্যাংকের নিয়মিত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং শেয়ারের দরে পতনের চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ব্যাংকটি

আর্থিক সংকটের মধ্যেও কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটি ৪০০ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০৫ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। উভয় অর্থবছরেই বিতরণের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ছিল।

নজরদারি জোরদার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

খেলাপি ঋণ কমানো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। মূলধন ঘাটতি ও উচ্চ খেলাপি ঋণে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়াতে প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ অবলোপন নীতিমালা আধুনিকায়ন করেছে এবং অর্থঋণ আদালতে চলমান মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দিচ্ছে। ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিত করার পাশাপাশি শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে সরাসরি নগদ অর্থ আদায়ে মাসিক ও ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন