নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত বলে দাবি মার্কিন প্রেসিডেন্টের; আলোচনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবশিষ্ট স্থাপনাগুলোতে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে হামলা চালানোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক বা দুটি স্থাপনা এখনো লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেগুলোতে হামলার পরিকল্পনাও প্রস্তুত রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে এ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তবে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
১০ মিনিটে হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত: ট্রাম্প
ইরানে সম্ভাব্য নতুন হামলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ এক বা দুটি স্থাপনা এখনো বাকি রয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আমরা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে এটি করতে পারি। এজন্য আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে এবং খুব দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে পারব।’
ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী বলেও মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে তেহরানের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না তিনি।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তারা চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পর আবার সেখান থেকে সরে আসে। এবার তারা সত্যিই চুক্তিতে সই করে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।’
নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা, সামরিক বিকল্প পর্যালোচনা
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর প্রস্তুতির মধ্যেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ট্রাম্প।
এর আগে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ-সংক্রান্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম বাড়িয়েছে পেন্টাগন। একই সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে থাকা কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা ও সরঞ্জামের অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে সামরিক সিদ্ধান্তে হিসাব-নিকাশ
যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। আগামী মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দলটির প্রতি জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। এ পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর সময় পিছিয়ে দিচ্ছে ওয়াশিংটন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আলোচনার সময় দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিয়েছে তেহরান—এমন ধারণাও করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেন্টকম ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হামলার প্রস্তুতি নিলেও নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর নির্দেশ নাও দিতে পারেন ট্রাম্প। তবে ইরানের পক্ষ থেকে আকস্মিক হামলার প্রস্তুতির কোনো লক্ষণ পাওয়া গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বিভাগও সম্ভাব্য উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রস্তুতি নিয়ে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানকে আলোচনায় ফেরার আরেকটি সুযোগ দিতে চাইছে হোয়াইট হাউস।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও চুক্তি নিয়ে সংশয়
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরানের অর্থনৈতিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। তবে তেহরান এমন কোনো চুক্তিতে সই করবে না, যার মাধ্যমে পুরোপুরি পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হয়—এমন আশঙ্কাও রয়েছে তাঁদের।
একইভাবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধের শর্তও ইরান মেনে নেবে না বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান নিউজ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের বৃহত্তর বিমান অভিযানের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ১০টি পরিবহন বিমান দক্ষিণ ইসরায়েলের একটি বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট ব্লিস ঘাঁটি থেকে এসেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে এসব বিমানে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সামরিক সরঞ্জাম ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কান নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বহরের অন্য কয়েকটি উড়োজাহাজ জর্ডান, কাতার ও সৌদি আরবেও অবতরণ করেছে। এর আগে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
ইসরায়েলি একটি সূত্র কান নিউজকে জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় চলছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াতে অতিরিক্ত একটি বিমানবাহী রণতরি এবং মেরিন সেনাদের একটি ইউনিট পাঠানোর বিষয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ইরান সীমান্তের কাছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের মহড়া
এর দুই সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ইরান সীমান্তের কাছাকাছি পর্যন্ত উড়ে গিয়ে আবার ইসরায়েলে ফিরে আসে।
অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই উড্ডয়ন ছিল একটি সামরিক মহড়া।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি, আঞ্চলিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে নতুন হামলা চালানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

