অনুসরণ করুন:
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

সার্বিয়ায় নোভি সাদ রেলস্টেশন দুর্ঘটনার দুই বছর, ন্যায়বিচারের দাবিতে আবারও রাজপথে মানুষ

১৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় এখনো শুরু হয়নি বিচার; ছাত্র আন্দোলনের বিজয়ের পর তদন্তে অগ্রগতির আশা স্বজনদের

সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে রোববার হাজার হাজার মানুষের সমবেত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দুর্ঘটনার পর শুরু হওয়া সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। এক সপ্তাহ আগে নির্বাচনে ছাত্র আন্দোলন-সমর্থিত জোটের বিজয় এবং ডানপন্থী ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা ছাড়ার প্রেক্ষাপটে এবার দুর্ঘটনার বার্ষিকী পালিত হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্কার করা রেলস্টেশনের কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে ছয় ও ১০ বছর বয়সী দুই বোনও ছিল। দুর্ঘটনার পর দেশজুড়ে শোকের পাশাপাশি স্টেশনটির সংস্কারকাজে ব্যয় করা কয়েক মিলিয়ন ইউরো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়।

দুর্ঘটনা থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা

২০০০ সালে সাবেক স্বৈরশাসক স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতনের পর সার্বিয়ায় এটিকে অন্যতম বৃহৎ গণবিক্ষোভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রেলস্টেশন দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।

গত রোববারের নির্বাচনে ছাত্র আন্দোলন-সমর্থিত জোটের বিজয়ে এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে জোটটি প্রায় ১৪০টি আসন পেয়েছে, যা এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা।

নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে আলেকজান্ডার ভুচিচের দল ক্ষমতা ছাড়ার কথা স্বীকার করেছে। এরপর থেকে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা দুর্নীতি ও আলোচিত হত্যাকাণ্ডের একাধিক তদন্তে অগ্রগতি দাবি করছেন। বিদায়ী সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের তদন্ত এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

ছেলেকে হারানো দিয়ানা হ্রকা আন্দোলনের প্রতীক

দুর্ঘটনায় ২৭ বছর বয়সী ছেলে স্তেফানকে হারানো দিয়ানা হ্রকা আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। দুর্ঘটনার স্থানে ফিরে যাওয়া তাঁর জন্য এখনো গভীর কষ্টের।

হ্রকা এএফপিকে বলেন, ‘যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল, সেখানে ফিরে যাওয়া খুবই কষ্টের।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবার সেখানে ফিরে যাওয়া আগের চেয়েও কঠিন হয়ে ওঠে।’

তবে ন্যায়বিচারের দাবিতে মানুষের সমর্থন তাঁকে আশার আলো দেখিয়েছে বলে জানান তিনি। গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হ্রকা বলেন, ‘মানুষের সমর্থন আমার কাছে অনেক বড় বিষয় ছিল।’

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি সমর্থনকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘যারা আমাকে সমর্থন করেছেন, যারা আন্তরিকভাবে চান আমরা সবাই একসঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করি, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার

নোভি সাদের রেলস্টেশন দুর্ঘটনা নিয়ে একাধিক তদন্ত চললেও এখনো কোনো মামলার বিচার শুরু হয়নি। দুর্ঘটনার কয়েক দিন পর পদত্যাগ করা সাবেক নির্মাণমন্ত্রী গোরান ভেসিচের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালে আরও ১২ জনের সঙ্গে জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টির অভিযোগে মামলা করা হয়।

রেলস্টেশন প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে পৃথক দুর্নীতির তদন্তেও সন্দেহভাজন হিসেবে রয়েছেন ভেসিচ। ওই তদন্তে সাবেক আরেক মন্ত্রী তোমিস্লাভ মোমিরোভিচসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।

এ ছাড়া রেলস্টেশন সংস্কারকাজে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থের সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করছে ইউরোপীয় পাবলিক প্রসিকিউটরস অফিস।

রাজনৈতিক পরিবর্তনে তদন্ত এগোনোর আশা

ছাত্র আন্দোলন-সমর্থিত জোটের নির্বাচনী বিজয়ের পর দুর্ঘটনার তদন্তে অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন হ্রকা। তাঁর বিশ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার পথ সহজ হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। এই মুহূর্তে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র প্রেরণা হলো—একদিন ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, এই বিশ্বাস।’

দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার গুরুত্ব তুলে ধরে হ্রকা আরও বলেন, ‘এখন যদি আমরা দায়ীদের কারাগারে পাঠাতে পারি, তাহলে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটবে না।’

তিনি আশা প্রকাশ করেন, কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে ভবিষ্যতে আর কখনো এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে রাজপথে নামতে হবে না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন