বিনামূল্যে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা দিয়ে এক দশক আগে ভারতের টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল ধনকুবের মুকেশ আম্বানির প্রতিষ্ঠান জিও। প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে দ্রুত গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানোর সেই কৌশল প্রতিষ্ঠানটিকে এখন ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজারমূল্যের কোম্পানিতে পরিণত করেছে।
সম্প্রতি ভারতের শেয়ারবাজারে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে জিও প্ল্যাটফর্মস। শেয়ারবাজারে অভিষেকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সংগ্রহ করেছে ৩২০ কোটি মার্কিন ডলার।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরুর পর জিওর শেয়ারের দাম প্রায় ২১ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ১৫০ কোটি ডলার। এর ফলে মূল প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের পরই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজারমূল্যের কোম্পানির অবস্থানে উঠে আসে জিও।
বিনামূল্যের ইন্টারনেট দিয়ে যাত্রা শুরু
২০১৬ সালে ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারে প্রবেশ করে রিলায়েন্স জিও। সে সময় দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ তুলনামূলক বেশি ছিল। এই পরিস্থিতিতে কয়েক মাস বিনামূল্যে ডেটা ও অন্যান্য সেবা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলে প্রতিষ্ঠানটি।
আকর্ষণীয় এই উদ্যোগের ফলে মাত্র ১৭০ দিনের মধ্যে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের ইতিহাসে এটি ছিল দ্রুততম গ্রাহক বৃদ্ধির অন্যতম ঘটনা।
তবে জিওর এই সাফল্যের পেছনে ছিল বিপুল বিনিয়োগ। বাজারে প্রবেশের সময় তরঙ্গ বরাদ্দ, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ও ফাইবার সংযোগ স্থাপনে প্রায় ২ হাজার ২৪৮ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কম মুনাফা কিংবা লোকসান মেনে নিয়েও বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সংগ্রহের কৌশল গ্রহণ করে জিও।
এর ফলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও ইন্টারনেট ও কলরেট কমাতে বাধ্য হয়। দেশজুড়ে স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।
প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যে গ্রাহকসংখ্যার বিচারে ভারতের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটরে পরিণত হয় জিও।
প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি অনেক প্রতিষ্ঠান
জিওর উত্থানে সাধারণ গ্রাহকেরা প্রথমদিকে কম খরচে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা পেলেও টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন ঘটে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকপ্রতি গড় আয় প্রায় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। এই সময়ে গ্রাহকপ্রতি গড় আয় ১ দশমিক ৩২ ডলার থেকে নেমে আসে প্রায় শূন্য দশমিক ৭৫ ডলারে।
মূল্য প্রতিযোগিতার চাপ সামলাতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বন্ধ করে দেয় কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়।
এয়ারসেল, ভিডিওকন, টেলিনর ইন্ডিয়া এবং টাটা টেলিসার্ভিসেসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার থেকে সরে যায় বা তাদের ব্যবসায়িক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে।
এমনকি মুকেশ আম্বানির ছোট ভাই অনিল আম্বানির প্রতিষ্ঠিত রিলায়েন্স কমিউনিকেশনসও আর্থিক সংকটে পড়ে ২০১৯ সালে দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়।
বর্তমানে ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারে জিও, ভারতী এয়ারটেল এবং ভোডাফোন আইডিয়ার সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণ ৯২ শতাংশের বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কম দামের সুবিধা কি ধরে রাখতে পেরেছেন গ্রাহকেরা?
জিওর আগমনে প্রথম কয়েক বছর ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জিও বিভিন্ন মোবাইল প্যাকেজের মূল্য প্রায় ১২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। পরে অন্য অপারেটরগুলোও একই পথে হাঁটে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাজারে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়ার পর গ্রাহকদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ের মূল্যসুবিধা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে।
তবে জিওর আইপিও-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে সেবার মূল্য বাড়ালেই যে প্রতিষ্ঠানের আয় সমান হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বেশি দামের কারণে গ্রাহকেরা তুলনামূলক সস্তা প্যাকেজ বেছে নিতে পারেন কিংবা অপারেটর পরিবর্তন করতে পারেন।
টেলিযোগাযোগ থেকে ডিজিটাল সাম্রাজ্য
মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবসার বাইরে জিও এখন ভারতের অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
ভিডিও স্ট্রিমিং, বিনোদন, খেলাধুলার সম্প্রচার, ক্লাউড স্টোরেজ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটির বেশি।
২০২০ সালে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা ও গুগল জিও প্ল্যাটফর্মসে কয়েক শ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। এসব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
জিও চালুর পর গত এক দশকে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৮ গুণ বেড়েছে।
এবার স্যাটেলাইট ইন্টারনেটে প্রতিযোগিতা
মোবাইল ইন্টারনেটের পর জিওর পরবর্তী বড় লক্ষ্য হতে পারে মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা।
প্রতিষ্ঠানটি নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে পারে জিও।
ভারতের বাজারে প্রবেশের অনুমোদন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতার মুখে রয়েছে স্টারলিংক। এ নিয়ে সম্প্রতি ভারতের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন ইলন মাস্ক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বক্তব্যে মাস্ক অভিযোগ করেন, ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারে বিদ্যমান বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষার কারণে স্টারলিংকের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মুকেশ আম্বানিকে ব্যঙ্গ করে তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ বলেও সম্বোধন করেন।
অন্যদিকে রিলায়েন্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি কখনো প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি। দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক—সব ধরনের বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের জন্য উন্মুক্ত বাজারেই তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে।
জিওর সাফল্য ঘিরে নতুন প্রশ্ন
জিওর উত্থান ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের বিস্তার দেশটির কোটি কোটি মানুষকে অনলাইন সেবার আওতায় নিয়ে এসেছে।
একই সঙ্গে এই সাফল্য টেলিযোগাযোগ খাতে বাজারকেন্দ্রীকরণ এবং বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জিওর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে গ্রাহকদের জন্য আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করবে, নাকি সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে প্রতিযোগিতা আরও সংকুচিত হবে।
ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিওর মাধ্যমে জিওর নতুন যাত্রা তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সাফল্য নয়; বরং দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, প্রতিবেদন: যশরাজ শর্মা।

