শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপের শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে আরও চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই বলেও সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ রেটিংস।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক মূল্যায়নে সংস্থাটি জানায়, জ্বালানি সরবরাহ ও প্রবাসী শ্রমিক—উভয় ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা বেশি। ফলে অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে পড়তে পারে।

ফিচের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বার্ষিক তেল আমদানি ব্যয় প্রায় ১২০ কোটি (১ দশমিক ২ বিলিয়ন) ডলার বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত এই ব্যয় দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশের সমান।

রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে আসা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক এসেছে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। ফিচ বলছে, বর্তমানে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো অবস্থানে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলের শ্রমবাজার সংকুচিত হলে প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফিচের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স কমে গেলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরতাও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফিচ। দেশের মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরাসরি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

এ ছাড়া দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে। এই এলএনজির প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করে কাতার। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ফিচের মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও মন্থর হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধিতে চাপ

ফিচের মূল্যায়নে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা বেড়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়।

তবে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে সরকারের চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

ভর্তুকির চাপে বাড়তে পারে বাজেট ব্যয়

জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারকে বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হতে পারে। এতে রাজস্ব বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া ও আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ফিচের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য, মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন