শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন না হলে তীব্র সংকটের শঙ্কা বাংলাদেশের

ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি; পানির অভাবে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও সুন্দরবনের মিষ্টি পানির সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা

ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এর আগে নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে বাংলাদেশে তীব্র পানিসংকট দেখা দিতে পারে। এতে দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক বরেন্দ্র এলাকায় বসবাসকারী ৭২ বছর বয়সী বিকাশ সরেনের মনে আছে, একসময় গঙ্গা নদী দিয়ে সারা বছর বড় বড় নৌকা চলাচল করত। ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীটি ছিল তাঁর গ্রামের পাশেই।

প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজক সরেন বলেন, “বছরে প্রায় তিন মাস এই নদীতে পানির কোনো প্রবাহই চোখে পড়ে না।” তাঁর ভাষ্য, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ধান ও গমের ফসল নষ্ট হয়ে গত মৌসুমে দুই কৃষক আত্মহত্যা করেন।

পানির প্রবাহ কমায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও মৎস্যসম্পদ

বাংলাদেশে পদ্মা নামে পরিচিত গঙ্গার প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীতে মাছের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একসময় নদীতে মাছ ধরতেন ৫৫ বছর বয়সী আবু বকর সিদ্দিক। এখন নদীর বদলে পুকুরে মাছ চাষ করছেন তিনি।

সিদ্দিক বলেন, “আমরা এখন মাছ কোথায় পাব? আমি আগে কত রকমের মাছ ধরতাম।”

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ অববাহিকায় প্রায় ৬৫ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশেরই পাঁচ কোটির বেশি মানুষ রয়েছেন।

ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে ১৯৯৬ সালের চুক্তি

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হবে। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজে শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

পানি বণ্টনবিষয়ক কারিগরি কমিটির প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, বাংলাদেশের এখন ‘পারস্পরিক সুবিধা ও শ্রদ্ধার’ ভিত্তিতে নতুন একটি চুক্তি প্রয়োজন।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। এসব নদীর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।

যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান বলেন, ভারত উজানে ‘অতিরিক্ত বাঁধ’ নির্মাণ করেছে। তাঁর মতে, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় নিতে হবে।

নবায়ন নিয়ে আলোচনা, ভারতের সাড়া মেলেনি

বাংলাদেশ জানিয়েছে, চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করতে ভারতকে চিঠি দেওয়া হলেও নয়াদিল্লি এখনো সাড়া দেয়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নদীসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত। কমিশনের সর্বশেষ কারিগরি বৈঠক হয়েছিল গত মে মাসে।

তবে কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের সর্বশেষ নিশ্চিত বৈঠক হয়েছিল ২০২২ সালে, দীর্ঘ ১২ বছরের বিরতির পর। অন্যদিকে, অভিন্ন তিস্তা নদীর পানি বণ্টনে প্রস্তাবিত চুক্তিও ২০১১ সাল থেকে ঝুলে রয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ঘটনাচক্রে, তাঁর স্বাক্ষর করা গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদও ওই মাসেই শেষ হচ্ছে।

এদিকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ফারাক্কা ব্যারেজ থেকেই বিরোধের সূত্রপাত

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ১৯৭৫ সালে, যখন ভারত ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। সে সময় বাংলাদেশের অভিযোগ ছিল, ভারত নদীর বেশির ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে।

পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৯৭৭ সালে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এক দশক পর ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে বাংলাদেশে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে বলে জানান ঢাকাভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন রিভারাইন পিপলের শেখ রোকন।

তিনি বলেন, “চুক্তিহীন বছরগুলোতে গঙ্গা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল এবং অন্তত তিনটি নদী প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল।”

এসব নদীর একটি গড়াই। নদীটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে মিষ্টি পানি সরবরাহ করে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ত পানি যাতে বনের ভেতরে বেশি প্রবেশ করতে না পারে, সে ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শেখ রোকনের ভাষ্য, দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জিকে প্রজেক্ট) পানির অভাবে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। প্রকল্পটি ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার ফসলি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন

পানিসংকট মোকাবিলায় গত মে মাসে ঢাকা ২৮০ কোটি ডলারের পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। প্রকল্পে ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে।

তবে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বাড়ানোর কোনো বিধান নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে পানি বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

শেখ রোকন বলেন, “আমরা যদি কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হই, তবে আমার আশঙ্কা, পরিস্থিতি অতীতে চুক্তিহীন বছরগুলোতে যা দেখেছিলাম, তার চেয়েও খারাপ হবে। কারণ, উভয় দেশেই এখন মিষ্টি পানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।”

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর থাকার সময়েও গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতাধীন জমির পরিমাণ কমে ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, “নদীতে যদি পর্যাপ্ত পানি না থাকে, তবে তার পরিণতি হতে পারে মারাত্মক বিপর্যয়কর।”

জলবায়ু পরিবর্তনে সংকট আরও জটিল

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি ও জনজীবন ক্রমেই চাপে পড়ছে। নদীর প্রবাহে পরিবর্তন, শুষ্ক মৌসুমে তীব্র খরা এবং বর্ষায় প্রবল বন্যা—সব মিলিয়ে কৃষিপ্রধান দেশটির সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। বন্যায় ফসলি জমি ও গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিকাজ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীটির প্রস্থ প্রায় তিন কিলোমিটার হয়েছে, যা এর স্বাভাবিক প্রস্থের প্রায় দ্বিগুণ।

ফিল্ডার বাজার গ্রামের ৫০ বছর বয়সী রেহানা খাতুন জানেন, নদীর এমন পরিবর্তন কতটা ভয়াবহ হতে পারে। বন্যায় নিজের বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার স্মৃতি এখনো তাঁকে তাড়া করে ফেরে। বর্তমানে একটি বাঁশের ঘরে বসবাস করছেন তিনি।

বন্যার সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে খাতুন বলেন, “নদীটি হিংস্র রূপ ধারণ করে তীরের সবকিছু গিলে খেতে শুরু করেছিল। আর বন্যার পানি নেমে যাওয়ার অনেক পরও সেই মানসিক ক্ষত শিশুদের মনে থেকে যায়।”

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমঝোতায় পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, নদীর পানির প্রবাহের সঙ্গে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, সেচব্যবস্থা ও সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য গভীরভাবে জড়িত।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন