মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

নভেম্বরের মধ্যে বন্ধ তিন সার কারখানা চালুর উদ্যোগ, উৎপাদন বাড়িয়ে ২৭ লাখ টনের লক্ষ্য

সার আমদানির ব্যয় কমাতে বন্ধ কারখানা সচল, বিদ্যমান কারখানার আধুনিকায়ন ও নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে বিসিআইসি।

দেশে সার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে আগামী নভেম্বরের মধ্যে বন্ধ থাকা তিনটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিদ্যমান কারখানার আধুনিকায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)।

সংস্থাটির আশা, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সার আমদানিতে ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ সহজ হবে। তবে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করাকে প্রধান শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বন্ধ তিন কারখানা চালুর উদ্যোগ

বিসিআইসি সূত্র জানায়, সংস্থাটির অধীন সাতটি সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চারটি চালু রয়েছে। গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকটে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড (টিএসপিএল), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)।

কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মেরামতকাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ধারিত চাপে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, টিএসপি ও ডিএপি কারখানা চালু করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি জানান, এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামাল পাওয়া গেলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে তারা আশাবাদী।

দেশীয় উৎপাদনে চাহিদার বড় অংশ পূরণ হচ্ছে না

দেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদার পুরোটা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে।

বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সার কারখানাগুলোতে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৬৮ হাজার ২৫৯ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন ডিএপি সার উৎপাদিত হয়েছে।

ওই অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসাবে রাষ্ট্রীয় কারখানায় উৎপাদিত ইউরিয়া দিয়ে জাতীয় চাহিদার প্রায় ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, টিএসপি ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনের অবদান ছিল যথাক্রমে প্রায় ৯ দশমিক ১০ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশেষ করে ফসফেটজাত সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বন্ধ টিএসপি ও ডিএপি কারখানা চালু করা গেলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়তে পারে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ভর করবে কারখানাগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন চালু রাখার ওপর।

ইউরিয়া আমদানিতে ব্যয় কমানোর লক্ষ্য

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, দেশের সারের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৪৪ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৯ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানি করতে হয়েছে।

তার ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো সহজ হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের সব সার কারখানা চালু করে ইউরিয়া সার আমদানি বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।

নভেম্বরের মধ্যে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি

বিসিআইসি সূত্র জানায়, আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং নির্ধারিত চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে গ্যাস সরবরাহকারী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। শিগগিরই গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে, ফসফরিক অ্যাসিডের ঘাটতি এবং সালফিউরিক অ্যাসিড প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় টিএসপি কমপ্লেক্সের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ ও প্ল্যান্টের মেরামতকাজ শেষ হলে কারখানাটি আবার চালু করা সম্ভব হবে। ডিএপি কারখানার উৎপাদনও ফসফরিক অ্যাসিডের স্বল্পতার কারণে বন্ধ রয়েছে।

বিসিআইসি আগামী নভেম্বরের মধ্যে টিএসপি ও ডিএপি কারখানার উৎপাদন পুনরায় শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে কাঁচামাল সংগ্রহ ও কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানা চালু করার পাশাপাশি যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদনব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখা কঠিন হতে পারে।

গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহে সমন্বয়ের ওপর জোর

ইউরিয়া সার উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। পর্যাপ্ত গ্যাস ও নির্ধারিত চাপ না থাকলে ইউরিয়া কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখা কঠিন। অন্যদিকে, টিএসপি ও ডিএপি সার উৎপাদনে ফসফরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন।

এ কারণে সার কারখানাগুলোর উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এবং সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বিসিআইসি।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান বলেন, সার কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে গ্যাস ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানাগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদনব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা গেলে দেশীয় সার উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। এতে আমদানির ওপর চাপ কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও সরবরাহের ওঠানামার প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

তিন থেকে পাঁচ বছরে উৎপাদন ২৭ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা

বিসিআইসির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বন্ধ কারখানা চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন কারখানা স্থাপনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সংস্থাটি আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করতে চায়।

এ লক্ষ্য অর্জনে পুরোনো প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন ইউরিয়া ও টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা চলছে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, শুধু বন্ধ কারখানা চালু করাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য বিদ্যমান কারখানার আধুনিকায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।

তবে এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ, কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং কারখানাগুলোর কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনের ব্যয় ও আমদানিকৃত সারের ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখাও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

কৃষি ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

দেশীয় সার উৎপাদন বাড়ানো গেলে কৃষি খাতে উৎপাদন উপকরণের সরবরাহ আরও স্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া কিংবা আমদানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে স্থানীয় উৎপাদন কৃষি খাতের ওপর চাপ কিছুটা কমাতে পারে।

একই সঙ্গে সার আমদানিতে ব্যয় কমানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাস পেতে পারে। তবে এ সুফল কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ, কারখানাগুলোর পরিচালন ব্যয় এবং আমদানির বিকল্প হিসেবে দেশীয় উৎপাদনের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর।

বিসিআইসির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সার উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর ভূমিকা আরও বাড়তে পারে। এ জন্য বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদনব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।

সরকারের লক্ষ্য, দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা। আগামী নভেম্বরের মধ্যে বন্ধ থাকা তিনটি কারখানা চালুর উদ্যোগ এবং তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন