মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি; প্রয়োজনে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং আগামী ৩১ অক্টোবরের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করার লক্ষ্যে বৈঠক করেছেন ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা। রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে মঙ্গলবার সকালে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নাগরিকদের বিভিন্ন সংকট, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক। তিনি ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচি সফল করতে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।

যেসব দাবিতে লংমার্চ

মামুনুল হক বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিতে এ লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং জুলাই গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবিও কর্মসূচিতে তুলে ধরা হবে।

১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে এর আগে চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলে দুটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ধারাবাহিকতায় আগামী ৩১ অক্টোবর তৃতীয় ধাপে ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।

বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে শুরু

মামুনুল হক জানান, আগামী ৩১ অক্টোবর সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মাধ্যমে লংমার্চ শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন শেষে এটি কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে।

আগের দুটি লংমার্চের মতো এবারও সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কর্মসূচি সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও জানান মামুনুল হক। তাঁর দাবি, কর্মসূচিতে কোনো বাধা বা অপতৎপরতা সৃষ্টি করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে।

তবে কর্মসূচিতে কোনো পক্ষ অপতৎপরতা চালালে তা প্রতিহত করে লংমার্চ সফল করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি

মামুনুল হক বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ১১ দলীয় ঐক্য এখন পর্যন্ত সহনশীল কর্মসূচি পালন করছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা হলেও বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণে সরকারের আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এ পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। জনগণের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ১১ দলীয় ঐক্যের এই নেতা।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান মামুনুল হক।

নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মামুনুল হক বলেন, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ১১ দলীয় ঐক্য নীরব থাকবে না। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।

পুলিশপ্রধানের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেন মামুনুল হক। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারসংক্রান্ত বক্তব্যকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাশিত নয়।

এ বিষয়ে দেশবাসী হতভম্ব ও স্তম্ভিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফর নিয়েও প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফর প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, সফরে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজনের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে বিনোদনমূলক সফরে পরিণত করার মতো আয়োজন দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান ১১ দলীয় ঐক্যের এই নেতা।

জাতীয় সংসদের আসন্ন চতুর্থ অধিবেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধানের পথে এগোবে কি না, তা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ রয়েছে। অধিবেশনের আগে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা আবারও বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন।

গোপালগঞ্জে কর্মসূচি নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান

গোপালগঞ্জের ওপর দিয়ে লংমার্চের গাড়িবহর যাওয়ার সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, তাঁরা এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবে পালন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করেন।

তিনি বলেন, গোপালগঞ্জে ইসলামপন্থী ও দেশপ্রেমিক বিপুলসংখ্যক মানুষ লংমার্চে অংশ নেবেন। কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অপতৎপরতা দেখা দিলে তা মোকাবিলায় তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

একই সঙ্গে গোপালগঞ্জের প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান মামুনুল হক। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সরকার ও প্রশাসনকে তার দায় বহন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

লংমার্চের স্থান নির্ধারণে আলোচনা

লংমার্চের কর্মসূচির স্থান নির্ধারণসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থানের সুযোগ-সুবিধা ও প্রবেশপথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে জেলা স্কুল এলাকায় স্থান সংকুলান ও প্রবেশপথের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মামুনুল হক বলেন, যারা অভিযোগ করছেন, তারাই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। তিনি দাবি করেন, ১১ দলীয় ঐক্য কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের অংশ নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কার, শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে।

জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের সংগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্যের পরিসর আরও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা

বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, জাগপা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ও এবি পার্টির প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন।

ব্রিফিং শেষে আগামী ৩১ অক্টোবরের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে সর্বস্তরের নাগরিক, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন মামুনুল হক।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন