পছন্দের খাবার তৃপ্তি নিয়ে খেলে বাড়ে মানসিক প্রশান্তি, তৈরি হতে পারে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
খাবার খাওয়ার সময় বেশির ভাগ মানুষই ক্যালরি, প্রোটিন, ফ্যাট কিংবা ওজন বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবেন। কিন্তু খাবারের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি এর স্বাদ ও তা থেকে পাওয়া আনন্দও যে সুস্থ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা অনেকেরই অজানা। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা খাবার থেকে পাওয়া এই আনন্দকে বলছেন ‘ভিটামিন পি’—অর্থাৎ ‘প্লেজার’ বা আনন্দ।
বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল ও পুষ্টিবিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুষ্টিকর খাবার খেলেই হবে না, খাবার উপভোগ করাও সুস্থ জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পছন্দের খাবার তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
মস্তিষ্কের রসায়ন ও হজমের সংযোগ
খাবার খাওয়ার আনন্দ শুধু মুখের স্বাদে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে মস্তিষ্কেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন থেরাপিস্ট ও পুষ্টিবিদ আলেটা স্টর্চ বলেন, খাবারসহ বিভিন্ন আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণে ভূমিকা রাখে। ডোপামিনকে সাধারণভাবে আনন্দ ও পুরস্কার-অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড পাথওয়ে’ বা পুরস্কার-প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে ভূমিকা রাখে।
স্টর্চের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পছন্দের খাবার আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করলে স্নায়ুতন্ত্র শিথিল হতে পারে এবং শরীর ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ বা বিশ্রাম ও হজমের উপযোগী অবস্থায় যেতে পারে। এতে হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলতে সহায়তা মেলে। তবে খাবার উপভোগ করলেই শরীর সব পুষ্টি উপাদান সম্পূর্ণ শোষণ করতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা নেই; পুষ্টি শোষণে আরও নানা শারীরিক বিষয় ভূমিকা রাখে।
২০১১ সালে ‘ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে মস্তিষ্কের ডোপামিন-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। গবেষণাটিতে বলা হয়, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ডোপামিনের প্রতি সংবেদনশীলতায় ঘাটতি থাকতে পারে, যা খাবার থেকে তৃপ্তি পাওয়ার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে কারও কারও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
সুস্থ খাদ্যাভ্যাসে খাবারের আনন্দ
খাবারের স্বাদ ও আনন্দ নিয়ে ২০২০ সালে ১১৯টি গবেষণার ভিত্তিতে করা একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় খাবার উপভোগ করা এবং সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের আরেকটি গবেষণাতেও খাবার উপভোগের সঙ্গে তুলনামূলক ভালো পুষ্টিগত অবস্থার সম্পর্ক উঠে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের সার্টিফায়েড ইনটুইটিভ ইটিং কাউন্সেলর ও পুষ্টিবিদ সারাহ গোল্ড আনজলোভার বলেন, সুস্থ থাকতে হলে স্বাদহীন ও একঘেয়ে খাবার খেতে হবে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু পছন্দের খাবার তৃপ্তি নিয়ে খেলে মানসিক সন্তুষ্টি বাড়তে পারে। এতে খাবার নিয়ে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ এবং একবারে অনেক বেশি খাওয়ার প্রবণতা কমাতেও সহায়তা মিলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম খাদ্যাভ্যাসের অর্থ শুধু ক্যালরি গণনা বা নির্দিষ্ট কিছু খাবার বাদ দেওয়া নয়। খাবারের পুষ্টিমান, ব্যক্তিগত চাহিদা এবং খাওয়ার অভিজ্ঞতা—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের আনন্দে মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক বন্ধন
খাবার কেবল শরীরের জ্বালানি নয়, এটি মানসিক তৃপ্তি ও সামাজিক সম্পর্কেরও অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার থেকে পাওয়া আনন্দ মানসিক সুস্থতায় বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক সংযোগ: পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, উৎসব কিংবা বিশেষ আয়োজনে খাবার প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে পরিচালিত একটি কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, প্রিয়জনদের সঙ্গে বসে খাবার উপভোগ করা মানুষের সুখের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি: অসুস্থতার সময় মায়ের হাতের গরম স্যুপ কিংবা পছন্দের কোনো মিষ্টি অনেকের মন ভালো করতে পারে। আনজলোভারের মতে, কঠিন দিনের শেষে এ ধরনের খাবার মানসিক আরাম দিতে পারে।
খাদ্যসংস্কৃতির বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি: প্রচলিত খাদ্যসংস্কৃতিতে অনেক সময় পছন্দের বা ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারকে ‘খারাপ’ কিংবা ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে খাবার নিয়ে ভয় ও অপরাধবোধ তৈরি হতে পারে।
আলেটা স্টর্চের মতে, পছন্দের খাবার খাওয়ার বিষয়ে অযথা কঠোর বিধিনিষেধ না থাকলে খাবার নিয়ে উদ্বেগ ও অপরাধবোধ কমতে পারে। তবে এর অর্থ পুষ্টির চাহিদা উপেক্ষা করা নয়; বরং খাবারের প্রতি ইতিবাচক ও ভারসাম্যপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলা।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ: ঐতিহ্যবাহী খাবার মানুষের সংস্কৃতি, পারিবারিক স্মৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। পছন্দের সাংস্কৃতিক খাবার থেকে দূরে সরে গেলে কেউ কেউ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার সময় সাংস্কৃতিক পছন্দ ও ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আবেগীয় খাওয়া আর আনন্দের জন্য খাওয়া এক নয়
অনেকেই খাবার উপভোগ করাকে ‘ইমোশনাল ইটিং’ বা আবেগের বশে খাওয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
পুষ্টিবিদ সারাহ গোল্ড আনজলোভারের ব্যাখ্যায়, রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ বা মানসিক চাপ সামলাতে অবচেতনভাবে খাবারের আশ্রয় নেওয়াকে আবেগীয় খাওয়ার একটি ধরন বলা যায়। অন্যদিকে, আনন্দের জন্য খাওয়ার ক্ষেত্রে খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও গঠন সচেতনভাবে উপভোগ করা হয়। যেমন—তীব্র গরমে আইসক্রিম খাওয়া কিংবা বাগান থেকে পেড়ে তাজা আপেল খাওয়া।
আনজলোভার বলেন, আবেগের বশে খাওয়ার পর কারও কারও মধ্যে অপরাধবোধ বা লজ্জা তৈরি হতে পারে। তবে সচেতনভাবে খাবার উপভোগ করাকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। অবশ্য আনন্দের জন্য খাওয়া এবং আবেগীয় খাওয়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
খাবারকে আরও ১০ শতাংশ আনন্দদায়ক করার কৌশল
প্রতিদিনের খাবারকে আরও উপভোগ্য করতে ছোট ছোট পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন আলেটা স্টর্চ। তাঁর মতে, খাবার বা নাশতা তৈরির সময় ভাবা যেতে পারে, কীভাবে সেটিকে আরও ১০ শতাংশ আনন্দদায়ক করা যায়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি হালকা গরম করে ব্রাউনি খাওয়া, সালাদের ওপর সামান্য চিজ কুচি যোগ করা কিংবা ওটমিলের বাটিতে একটু বেশি দুধ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। ছোট এসব পরিবর্তন সাধারণ খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতাকে আরও উপভোগ্য করে তুলতে পারে।
তবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থা, খাদ্য-অ্যালার্জি কিংবা চিকিৎসকের দেওয়া খাদ্যনির্দেশনা থাকলে সেগুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে, সুস্থ থাকার জন্য খাবারের পুষ্টিমান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাবার থেকে পাওয়া তৃপ্তি ও আনন্দও উপেক্ষা করার নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পছন্দের খাবার সচেতনভাবে উপভোগ করা মানসিক প্রশান্তি ও খাবারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।

