প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন; গণতন্ত্রের সংকটের পাশাপাশি বিরোধী ঐক্য ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা
ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের জেরে দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভের কথা তুলে ধরা হয়েছে একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে। নিবন্ধটির দাবি, বিক্ষোভ দমনে ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন, সড়কে ব্যারিকেড, ট্রেন বাতিল এবং মেট্রো স্টেশন বন্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিবাদ কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামের একটি তরুণদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বে এই আন্দোলন চলছে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে আপত্তি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ভারতের আরও কয়েকটি বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষণটিতে আন্দোলনকে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিরোধী দলগুলোর সমন্বয় এবং সুনির্দিষ্ট দাবিকে ঘিরে গণআন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুরু হওয়া ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) কর্মসূচির আওতায় ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুয়া ও অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পেতে পারে।
নিবন্ধে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে নিবন্ধিত ভোটারদের প্রায় ১২ শতাংশের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যের সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।
একটি পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিজেপির জেতা বেশ কয়েকটি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল। তবে এ তথ্য একাই প্রমাণ করে না যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কারণেই নির্বাচনের ফল বদলে গেছে।
নিবন্ধে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের ১৪টি আপত্তি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সেগুলো প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সিজেপি তাঁর পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলনে নামে বলে নিবন্ধে বলা হয়েছে।
ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষণটিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর আইনের প্রয়োগ এবং গণমাধ্যমের মালিকানায় করপোরেট প্রভাব বৃদ্ধিকে গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিবন্ধে ফ্রিডম হাউসের ২০২১ সালের মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়েছে, সংস্থাটি ভারতকে ‘মুক্ত’ থেকে ‘আংশিক মুক্ত’ শ্রেণিতে নামিয়ে আনে। পাশাপাশি সুইডেনভিত্তিক ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের মূল্যায়নে ভারতকে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনের পেছনে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি
নিবন্ধের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিজেপির রাজনৈতিক শক্তির পেছনে দলটির নিজস্ব সাংগঠনিক ও আর্থিক সামর্থ্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) বিস্তৃত নেটওয়ার্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন, দাতব্য সংস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনটির উপস্থিতিকে বিজেপির সমর্থক সংগঠিত করার সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
লেখকের মতে, এই সাংগঠনিক শক্তি ও গণমাধ্যমে প্রভাবের কারণে মোদি সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা সহজ হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ বড় আকার ধারণ করলেও তা দ্রুত ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে—এমন সম্ভাবনা সীমিত।
তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে
বিশ্লেষণটিতে আন্দোলনের প্রথম ইতিবাচক দিক হিসেবে তরুণদের রাজনৈতিক সক্রিয়তার কথা বলা হয়েছে। লেখকের মতে, এই আন্দোলন তরুণদের মধ্যে এমন ধারণা ফিরিয়ে আনছে যে সম্মিলিত জনআন্দোলনের মাধ্যমে শক্তিশালী সরকারকেও চাপে ফেলা সম্ভব।
নিবন্ধে এর আগে প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে তরুণদের বিক্ষোভ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রসঙ্গও এসেছে। শিক্ষিত বেকারত্ব ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গুরুত্বের কারণে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে বলে সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ভারতের জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির একটি সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে নিবন্ধে বলা হয়েছে, তিনি নিজেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মনে না করলেও গণতন্ত্রের ভিত্তি ঝুঁকির মুখে পড়েছে—এমন উপলব্ধি থেকে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছেন বলে জানিয়েছেন।
বিভিন্ন গোষ্ঠীকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা
আন্দোলনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আইনজীবী, কৃষক সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীদের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের মতে, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন দাবিতে একত্র করা আন্দোলনের শক্তি বাড়াতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সিজেপির সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। সিজেপি তরুণদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক উদ্দীপনা তৈরি করতে পারে, আর প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলো দিতে পারে সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা।
লেখকের মতে, সব নীতিগত বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর একমত হওয়া জরুরি নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু গণতান্ত্রিক দাবি ঘিরে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুনির্দিষ্ট দাবিকে ঘিরে আন্দোলনের কৌশল
আন্দোলনের তৃতীয় দিক হিসেবে সুনির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে জনসমর্থন সংগঠিত করার কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে লবণবাণিজ্যে ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা একটি স্পষ্ট দাবিতে পরিণত হয়েছিল।
বর্তমান আন্দোলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে কাজ করছে বলে নিবন্ধে বলা হয়েছে। লেখকের মতে, নির্দিষ্ট লক্ষ্য আন্দোলনকে কৌশলগত নমনীয়তা দেয় এবং প্রয়োজনে সাময়িক বিরতির পরও সাংগঠনিক ভিত্তি ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করে।
২০২৯ সালের নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক হিসাব
নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিজেপির সাংগঠনিক ও আর্থিক শক্তি এখনও উল্লেখযোগ্য। ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারের হাতে আন্দোলনের প্রভাব মোকাবিলা, বিরোধী শিবিরের বিভক্তিকে কাজে লাগানো এবং জনমত অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনকে সরকারের জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কারণে ভারতের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে কি না, সে বিষয়ে নিবন্ধে সতর্ক মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সবশেষে বিশ্লেষণটির বক্তব্য, এই আন্দোলন রাতারাতি ভারতের গণতান্ত্রিক সংকট দূর করতে না পারলেও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত প্রতিবাদ যে নিষ্ফল নয়—সেই বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।

