শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

অনলাইন বিজ্ঞাপনের আড়ালে কোটি মানুষের ওপর নজরদারি, ইসরায়েলি সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও ট্র্যাক, কিছু ক্ষেত্রে স্মার্টফোনে স্পাইওয়্যার প্রবেশের অভিযোগ; গুগলসহ একাধিক প্ল্যাটফর্ম থেকে বাদ ডিসকভার-টেক

অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি এবং কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের ডিভাইসে স্পাইওয়্যার প্রবেশ করানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থা ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে। দুটি গবেষণা সংস্থার পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটি অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও ট্র্যাক করত এবং নজরদারি কার্যক্রমে ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরুসহ কয়েকটি সংস্থাকে সহায়তা করেছিল।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে কানাডাভিত্তিক সাইবার গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাব এবং নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন নিরাপত্তা সংস্থা কনফিয়ান্ত এসব তথ্য তুলে ধরে। তাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন গুগল, কমকাস্ট, রাশিয়ার ইয়ানডেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাত।

গবেষকদের মতে, অনলাইন বিজ্ঞাপন দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলেও এই ঘটনা দেখিয়েছে, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাকে ব্যাপক নজরদারি ও সাইবার হামলার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।

১ লাখ ২০ হাজার ওয়েবসাইট ও ৭৫ হাজার অ্যাপে বিজ্ঞাপন

সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট এবং ৭৫ হাজার অ্যাপে পৌঁছেছিল। এসব বিজ্ঞাপনের অনেকগুলোই ফোন বা ইয়ারপডের মতো সাধারণ পণ্যের প্রচারণা হিসেবে তৈরি করা হতো।

গবেষকদের দাবি, এসব বিজ্ঞাপনযুক্ত ওয়েবসাইট বা অ্যাপে প্রবেশ করলেই ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণ করার সুযোগ তৈরি হতো। কিছু ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ফোন নম্বর সংগ্রহের চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষক উলফি ক্রিস্টল রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান অনলাইন বিজ্ঞাপনব্যবস্থা একটি কাঠামোগত নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে। রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজসহ সব পক্ষই এ ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ক্যান্ডিরুর স্পাইওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগ

দুটি গবেষণা সংস্থাই বলেছে, ডিসকভার-টেকের কিছু বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে ক্যান্ডিরুর স্পাইওয়্যার প্রবেশ করাতে সহায়তা করেছিল। তবে কনফিয়ান্তের দাবি, ক্যান্ডিরুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনের সংখ্যা ডিসকভার-টেকের মোট বিজ্ঞাপনের তুলনায় খুবই কম ছিল।

ক্যান্ডিরু এমন একটি স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যেটিকে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ কালো তালিকাভুক্ত করে। সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদদের লক্ষ্য করে নজরদারির কাজে ব্যবহারের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

সিটিজেন ল্যাবের দাবি, ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছড়ানো ক্যান্ডিরুর একটি শক্তিশালী স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ৪৫টি উইন্ডোজ ডিভাইস হ্যাক করা হয়েছিল। আল জাজিরার নেটওয়ার্ক লগ বিশ্লেষণ করে তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থাটি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাঠানো বার্তার জবাব দেয়নি আল জাজিরা।

প্রতিদিন কোটি বিজ্ঞাপন, প্রভাবিত কয়েক কোটি মানুষ

কনফিয়ান্তের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেরোম ডাঙ্গুর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিসকভার-টেক বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন অন্তত এক কোটি বিজ্ঞাপন প্রচার করছিল। কুকি ম্যাচিং নামের তথ্য বিনিময়প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সংস্থাটি বিজ্ঞাপনের সরাসরি পরিসরের বাইরেও মানুষকে অনুসরণ করার সুযোগ পেত।

ডাঙ্গুর ধারণা, ডিসকভার-টেকের কার্যক্রমে কয়েক কোটি মানুষ প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, পেন্টাগন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ সংবেদনশীল শত শত নেটওয়ার্কের ব্যবহারকারীদের কাছে এসব ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন পৌঁছেছিল। এনভিডিয়া, স্যানডিস্ক, ব্রডকম ও মাইক্রনের মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কেও বিজ্ঞাপনগুলো দেখা গেছে বলে তাঁর দাবি।

সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় কমিশন এবং এক ডজনেরও বেশি দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত নেটওয়ার্কেও এসব বিজ্ঞাপন পৌঁছানোর প্রমাণ তারা পেয়েছে।

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বিজ্ঞাপনের আধিক্যের দাবি

কনফিয়ান্তের দাবি, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মতো কিছু এলাকায় ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন বিশেষভাবে বেশি দেখা গেছে। ডাঙ্গু বলেন, ফিলিস্তিনের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এসব বিজ্ঞাপনের ব্যাপক উপস্থিতি পুরো অঞ্চলের ডিজিটাল কার্যক্রমের ওপর নজরদারির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সিটিজেন ল্যাব আরও জানিয়েছে, ডিসকভার-টেকের কিছু প্রমাণীকরণ লগ অনিচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। এসব লগ বিশ্লেষণ করে ইসরায়েল, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) ঠিকানা থেকে সংস্থাটির ব্যবস্থায় লগইন করার তথ্য পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিল গুগল ও কমকাস্ট

গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে অনলাইন বিজ্ঞাপন খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান।

গুগল জানিয়েছে, সিটিজেন ল্যাব ও কনফিয়ান্তের তদন্তে তারা সহযোগিতা করেছে এবং নিজেদের নীতিমালা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘনের কারণে ডিসকভার-টেককে বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

ডিজিটাল বিপণন ও বিজ্ঞাপন খাতের ইউরোপীয় সংস্থা আইএবি ইউরোপ জানিয়েছে, নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর গত সপ্তাহে ডিসকভার-টেককে তাদের বিশ্বব্যাপী অনুমোদিত বিক্রেতাদের তালিকা থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

কমকাস্টের বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিসওয়াক্সও জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ডিসকভার-টেককে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পাঠানো বার্তার জবাব দেয়নি রাশিয়ার ইয়ানডেক্স।

২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিসকভার-টেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ ফরম, লিংকডইন এবং প্রধান নির্বাহী ডেকেল বোনিকে পাঠানো ইমেলেরও জবাব মেলেনি। ক্যান্ডিরুর মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও সফল হয়নি।

বিজ্ঞাপননির্ভর নজরদারি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

গবেষকদের অনুসন্ধান অনলাইন বিজ্ঞাপনব্যবস্থার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাধারণ পণ্যের বিজ্ঞাপনের আড়ালে ব্যবহারকারীদের অবস্থান, পরিচয় ও ডিভাইসসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ থাকলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গবেষণা সংস্থাগুলোর অভিযোগের বিষয়ে ডিসকভার-টেক বা ক্যান্ডিরুর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন