চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি। কমিটির অভিযোগ, জনমত গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই গুরুত্বপূর্ণ এ টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের আর্থিক, কারিগরি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জনসমক্ষে তুলে ধরার পাশাপাশি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ দাবিতে আগামী ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের সামনে গণঅনশনের ডাক দিয়েছে কমিটি। কর্মসূচিতে শ্রমিক, কর্মচারী, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত কমিটির এক জরুরি সভায় এসব দাবি ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সকাল ১১টায় স্থানীয় একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক নেতা তপন দত্ত।
চুক্তির শর্ত প্রকাশ ও স্বাধীন মূল্যায়নের দাবি
সভায় বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগে জনমত ও জাতীয় স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে তাঁদের অভিযোগ।
নেতারা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে চুক্তির আর্থিক ও কারিগরি দিকগুলো স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে টার্মিনালটির দায়িত্ব দেওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব আয় ও জাতীয় নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা করার আহ্বান জানান তাঁরা।
কমিটির নেতাদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সুযোগগুলো তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
জাতীয় অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে এ বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং বাণিজ্যিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাঁদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত চুক্তির শর্ত, আর্থিক প্রভাব এবং দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা অর্জন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত বিবেচনা করা প্রয়োজন বলেও মত দেন তাঁরা।
নেতারা আরও বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা। জনগণের আস্থা নিশ্চিত না করে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
বিদেশি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের তুলনামূলক মূল্যায়ন চায় কমিটি
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে প্রস্তাবিত পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য সুফল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বিকল্পের সঙ্গে তুলনা করে দেখার আহ্বান জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি।
কমিটির নেতারা বলেন, প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বন্দরের রাজস্ব আয় কতটা বাড়তে পারে, পরিচালন সক্ষমতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের কী সুযোগ রয়েছে—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, কেবল পরিচালনাগত দক্ষতা বা বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনা করলেই হবে না; একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, রাজস্ব আয়, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার এবং বন্দরের নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আধুনিকায়নের বিরোধিতা নয়, জাতীয় স্বার্থে গুরুত্ব
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, তাঁরা বন্দরের কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিচালনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি কিংবা বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধী নন। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা, রাজস্ব আয়, শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তাঁদের বক্তব্য, বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ এমনভাবে নিতে হবে, যাতে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
নেতারা আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো চুক্তি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চুক্তির শর্ত প্রকাশ, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করা জরুরি।
১২ অক্টোবর গণঅনশনে অংশ নেওয়ার আহ্বান
এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ এবং চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে আগামী ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের সামনে গণঅনশন কর্মসূচি পালন করবে বন্দর রক্ষা কমিটি।
এ কর্মসূচিতে শ্রমিক, কর্মচারী, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী এবং সর্বস্তরের মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির নেতারা।
তাঁদের ভাষ্য, বন্দর রক্ষার আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে না। বরং জাতীয় সম্পদ, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সভায় উপস্থিত নেতারা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে বিবেচিত যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সভায় শ্রমিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত
বন্দর রক্ষা কমিটির জরুরি সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম জামাল উদ্দিন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) চট্টগ্রাম শাখার যুগ্ম সমন্বয়ক রবিউল হক শিমুল, ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের (টিইউসি) যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভাগীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক আবদুল বাতেন।
সভায় নেতারা এনসিটি ইজারা চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ, স্বাধীন আর্থিক ও কারিগরি মূল্যায়ন এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে এসব দাবি আদায়ে ১২ অক্টোবরের গণঅনশন কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ কামনা করেন তাঁরা।

